জুয়েল চৌধুরী। নব্বই দশকে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। দেশটিতে ছিলেন তার বড় ভাই, ভাবি। পড়াশোনার জন্য গেলেও বর্তমানে সেখানেই নিজের কর্মসংস্থান করে নিয়েছেন! পাশাপাশি সংগীত চর্চার বদৌলতে পরিচিত হয়ে উঠেছেন আফ্রিকার সংগীত অঙ্গনেও! গান করেছেন সেখানকার স্থানীয় শীর্ষ সংগীতশিল্পীদের সাথে।
বিশেষ করে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড এর মনোনয়নপ্রাপ্ত দক্ষিণ আফ্রিকার জনপ্রিয় গায়ক এসজাভার সঙ্গে একাধিক গান করে পেয়েছেন শ্রোতাপ্রিয়তাও। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতিতে কীভাবে জুয়েল মিশে গেলেন? সেই গল্পই তিনি করেছেন চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে।

কথায় কথায় জুয়েল জানিয়েছেন, উচ্চশিক্ষার জন্য আফ্রিকা গেলেও সংস্কৃতি চর্চার প্রতি পারিবারিক আবহটাই ছিলো তার প্রধান সঙ্গী। ঢাকায় গেন্ডারিয়ায় জন্ম জুয়েলের। তার পুরো পরিবার সংস্কৃতি অঙ্গনের সাথে জড়িত ছিলেন। বড় বোন, ভাইয়েরা ছিলেন সংস্কৃতিমনা। কেউ গান করতো, কেউ আবার অভিনয়। গানের সাথে জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি জুয়েল পারিবারিক সূত্রেই পেয়েছেন।
শুরুটা কচিকাচার আসর দিয়ে। এখানেই তিনি প্রথম পাঠ নেন গানের! তখন নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন জুয়েল। পরে ১৯৭৯ সালে প্রথম বিটিভিতে পারফর্ম করেন। অভিনয়ও করেছেন। বিটিভিতে প্রচারিত সেই সময়ে ইমদাদুল হক মিলনের লেখা জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘কোন কাননের ফুল’-এও অভিনয় করেছেন জুয়েল।
তবে গানের প্রতিই ছিলো তার প্রধান আকর্ষণ। সেই আগ্রহ থেকেই ব্যান্ড মিউজিক শুরু করেন ১৯৮২ সাল থেকে। ৮৪-৮৬ এর দিকে ‘মিউজিক টাচ’ এর সাথে বেইজ গিটারিস্ট হিসেবে জড়িত ছিলেন জুয়েল। নব্বইয়ের শুরুতে বহু ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানেও গান করেছেন তিনি। সোমবার (২০ মে) আফ্রিকা থেকে মুঠোফোনে কথা বলতে গিয়ে পুরনো স্মৃতির কথাই বার বার বলছিলেন এই শিল্পী।
দেশে থাকতে হার্ড রককে বেশি গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন জুয়েল। কিন্তু আফ্রিকা যাওয়ার পর সেই রুচির পরিবর্তন ঘটে। এ বিষয়ে তার ভাষ্য, “দেশে থাকতে আফ্রিকান মিউজিকের প্রতি আকর্ষণ ছিল। বব মার্লে আমার পছন্দের শিল্পী। হার্ড রক শুনে বড় হয়েছি, কিন্তু সশরীরে এখানে এসে দেখি হিপহপ চলে। যেহেতু সংগীতের প্রতি আকর্ষণ ছিলো, তাই বিভিন্ন ক্লাবে যেতাম গান শুনতে। সেখানে থাকতে থাকতে ‘কোয়াইটে মিউজিক’ এর প্রতি আকর্ষণ তৈরী হয়। এখানে যারা গান করে তাদের সাথে পরিচয় হয়। আমার আফ্রিকান গার্লফ্রেন্ড তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। ঢেকি স্বর্গে গেলেও… এরকম একটা কথা আছে না; সেটাই হয়। শুরুতে হাউজ মিউজিকের কয়েকটি ট্র্যাক করি। ২০০৬ সালে আমি যখন প্রথম রেকর্ড করি, খুবই নার্ভাস ছিলাম। ট্র্যাকটির নাম ছিলো ‘মানি হানি’। আফ্রিকায় এটাই আমার শুরু।”

“আফ্রিকান একজন আইকন শিল্পীর সাথে ট্র্যাক করি। পরে ৩০ জনের মতো মানুষের সাথে হাউজ মিউজিক করেছি। প্রথম অ্যালবাম ছিলো ‘পেইন কিলার’। ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়। ১০টির মতো গান ছিলো। এরপর করি ‘হট বেবি’ অ্যালবাম। এটি ফ্লপ করে। এরপর আবার হিপহপে চলে আসি। আমেরিকান হিপহপ এখানে ফলো করে সবাই। এটা খুব ভালো চলে।”
২০২৪ সালের দিকে জুয়েলের পরিচয় হয় আফ্রিকান জনপ্রিয় শিল্পী অ্যামি মনোনয়নপ্রাপ্ত এসজাভার সঙ্গে। সে বিষয়ে জুয়েলের ভাষ্য,“প্রথমে উনি আমাকে দেখে বলেন ‘ওর সাথে কী গান করবো? ওতো ইন্ডিয়ান, সে কি আমাদের মতো গান করতে পারবে?’- এমনটা ভাবা খুব স্বাভাবিক। একেতো আমি অন্যভাষার, অন্য দেশের মানুষ; তারউপর আমার কোনো পরিচিতিও নাই। কিন্তু আমি যখন গাইলাম তার সামনে, সে অবাক হয়। আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘তরে দেখতে লাগে একরকম, কিন্তু গানতো দারুণ করিস।’ উনি আমার আগের গান দেখেও আমার সাথে কো-লাবরেট করতে রাজি হন। তার মতো পপুলার আর্টিস্ট একটা গানের জন্য অন্তত বাংলাদেশি টাকায় ৫ লাখের মতো টাকা নেয়, কিন্তু এসজাভা আমার কাছ থেকে কোনো পয়সা নেয়নি। উনি ভিন্নভাষি মানুষের কাছে আফ্রিকান গান শুনে এতোটাই প্লিজড ছিলেন!”
এসজাভার সাথে জুয়েল প্রথম গান করেন ২০১৫ সালে। গানটির নাম ‘শো মি দ্য মানি’। এমটি নামের আরো একজনসহ চার জনের কোলাবরেশন ছিলো এটি। জুয়েল বলেন,“দারুণ জনপ্রিয়তা পায় গানটি। আমার খুব ভাল লাগার একটা অনুভূতি আছে গানটি নিয়ে। ২০১৬ সালে আরো একটি গান করি, নাম ‘শরাব’। হিন্দি গান এটি। এস জাভা জুলু ভাষায় গাইলো, আমি গাইলাম হিন্দিতে, জজি মেন্টাল গাইলো সোথোতে। এটাও পপুলার হয়। এটা সাউথআফ্রিকার প্রথম মাল্টিল্যাংগুয়েজ গান! আফ্রিকার বিভিন্ন রেডিওতে গানটি চলে।”
আন্ডারগ্রাউন্ড শিল্পী বললেও জুয়েল ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে সেখানকার মিডিয়াতে জুয়েলকে নিয়ে প্রায়শই ছাপা হয় আর্টিকেল। রেডিও কিংবা স্থানীয় টেলিভিশনে পারফর্ম করার পাশাপাশি সমাজসচেতনতার বার্তা দিতেও তার ডাক পড়ে। জুয়েলের মতে, ভিন্নভাষি হয়েও আফ্রিকান ভাষা কিংবা গানের প্রতি আমার আগ্রহের কারণেই তারা আমাকে বেশি গুরুত্ব দেন।
ভবিষ্যতে আফ্রিকান ভাষার সাথে বাংলার ফিউশন করে গান তৈরীরও ইচ্ছে রাখেন জুয়েল। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশি এই প্রজন্মের শিল্পীদের সাথেও তিনি গান করতে ভীষণ আগ্রহী। কথায় কথায় জুয়েল জানালেন, আমি যে ধাঁচের গান করি, বাংলাদেশে অনেকেই এখন এমন গান করছেন। আমি নিয়মিত দেশের গানের হালচাল নিয়ে খোঁজ রাখি। আমার ভীষণ পছন্দ ঐশী, জেফারের গানের ধরন। তাদের সাথে কোলাবরেশন করতে পারলে ভাল লাগবে। তাছাড়াও গানবাংলার কৌশিক তাপসের সংগীতও আমার ভাল লাগে, জালালি সেট-এর সাথে যদি কখনো কাজের সুযোগ হয়, সেটাতো ভীষণ আনন্দের হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশের এদের কারো সাথেই আমার যোগাযোগ নেই। তারা যদি আগ্রহী হন তবে আমি বিট এবং ভোকাল পাঠাতেও রাজি। আফ্রিকান গানের পাশাপাশি বাংলা গান করার সুযোগ থাকলে অবশ্যই করতে চাই।
বর্তমানে গান নিয়ে ব্যস্ততার কথা জানতে চাইলে জুয়েল বলেন, “দীর্ঘদিন পর এসজাভার সাথে আবারও গান করেছি। এরইমধ্যে গানের সব কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নতুন এই গানটির নাম ‘স্থান্ডাসাম’। ইংরেজিতে ‘লাভার’। আগামি জুলাইতে গানটি রিলিজের পরিকল্পনা আছে। গানটি আমি গেয়েছি ইংরেজিতে, এসজাভা গেয়েছে জুলু ভাষায়। হিপহপ ফিউশনধর্মী গান।”








