নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা বিধির বহুল আলোচিত গেজেট গ্রহণ করে ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞার নেতৃত্বাধীন পাচ বিচারপতির আপিল বিভাগ যে আদেশ দিয়েছিলেন তা স্থগিত করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বিভাগ বেঞ্চ এসংক্রান্ত রিভিউ শুনানির পর গেজেট গ্রহণের আদেশটি স্থগিত করে এবিষয় আপিলের অনুমতি দিয়ে আদেশ দেন।
আদালতে রিভিউ আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
আজকের আদেশের পর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ২০১৮ সালে গেজেট গ্রহণের সেই আদেশটি স্থগিতের ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বিষয়ে হাইকোর্টে চলমান রুল শুনানি ও নিষ্পত্তি করতে কোন বাধা রইলো না। সেই সাথে কোন (ভ্যাকুয়াম) শূন্যতা যাতে তৈরি না হয় সে জন্য অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত গেজেটের কার্যকারিতা এখন চলমানই থাকবে।’
বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির এই গেজেট প্রকাশের আগে বিধিমালায় আপত্তি জানিয়ে তা আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠিয়েছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা।
আর এই গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের উপর শাসন বিভাগের কর্তৃত্ব ফুটে উঠেছে দাবি করে তখন উদ্বেগ জানিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড.কামাল হোসেন, রফিক-উল হক, এম আমীর-উল ইসলাম, মইনুল হোসেন, এ এফ হাসান আরিফ ও ফিদা এম কামাল সহ সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবীরা।
১৯৯৪ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড একধাপ নামিয়ে দেওয়া হলে ততকালীন জেলা জজ ও জুডিশিয়াল এসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব মাসদার হোসেনসহ ২১৮ জন বিচারক হাইকোর্টে রিট করেন। এরপর অনেক বিচারক সে রিটে পক্ষভুক্ত হন। এই রিট শুনানির পর ১৯৯৫ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত করে বিচারকদের বিসিএস ক্যাডারভুক্ত করার বৈধতার প্রশ্নে রুল জারি করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ৭ মে রুল যথাযথ ঘোষণা করে জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস করার রায় দেন। তবে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। সে আপিলের শুনানি শেষে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার চূড়ান্ত রায় দেন।১২ দফা নির্দেশনার মধ্যে ছিল-
১) সংবিধানের ১৫২ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সব বিভাগের কাজ সার্ভিস অব রিপাবলিকের ভেতরে পড়বে। তবে বিচার বিভাগের কাজ ও অবকাঠামোর সঙ্গে প্রজাতন্ত্রের সিভিল সার্ভিসের অনেক ভিন্নতা রয়েছে। বিচার বিভাগকে অন্যান্য সিভিল সার্ভিসের সঙ্গে একত্রিত করা যাবে না।
২) বিচারিক হাকিমদের নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করা এবং নির্বাহী বিভাগের হাকিমরা বিচারিক কাজ করতে পারবেন না।
৩) সিভিল সার্ভিস অর্ডার ১৯৮০ অনুযায়ী, সব হাকিমকে পিএসসির অধীনে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে একসঙ্গে নিয়োগ দেওয়া হয়। একসঙ্গে নিয়োগ দেওয়া সংবিধান পরিপন্থি।
৪) এই রায় পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন বিধিমালা এবং কমিশন গঠন করতে হবে।
৫) সংবিধানের ১১৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জুডিশিয়ারির সবার চাকরির বিধিমালা (নিয়োগ, পদায়ন, বদলি পদোন্নতি ও ছুটিসহ অন্যান্য) প্রণয়ন করবেন।
৬) রাষ্ট্রপতি জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন বিধিমালা প্রণয়ন করবেন।
৭) সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের থাকবে।
৮) বিচার বিভাগ জাতীয় সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকবে না এবং বিচারিক হাকিমসহ সব বিচারক স্বাধীনভাবে কাজ করবেন।
৯) জুডিশিয়ারির (নিম্ন আদালত) বার্ষিক বাজেট প্রণয়নের ওপর নির্বাহী বিভাগের কোনো হাত থাকবে না। এই বাজেট সুপ্রিম কোর্ট প্রণয়ন এবং বরাদ্দ করবে।
১০) জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যরা প্রশাসনিক আদালতের আওতাভুক্ত থাকবেন।
১১) এই রায় অনুযায়ী বিচার বিভাগ পৃথককরণের জন্য সংবিধানে কোনো সংশোধন করার প্রয়োজন নেই। তবে পৃথককরণ আরও অর্থবহ করতে যদি সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তবে তা করা যাবে।
১২) জুডিশিয়াল পে-কমিশন: জুডিশিয়াল পে-কমিশন জুডিশিয়ারির সদস্যদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ না করবে, ততদিন পর্যন্ত বর্তমান অবকাঠামো অনুযায়ী তার সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন।
ঐতিহাসিক মাজদার হোসেন মামলার রায়ের আট বছর পর ২০০৭ সালে মূল নির্দেশনাটি বাস্তবায়ন করে বিচার বিভাগকে আলাদা করা হয়। তবে অপর নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের বিষয়টি ঝুলে থাকে।
একপর্যায়ে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালার খসড়া প্রস্তুত করে সুপ্রিম কোর্টে পাঠায় আইন মন্ত্রণালয়। তবে সরকারের খসড়াটি ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার অনুরূপ হওয়ায় তা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থি বলে শুনানিতে বলেন ততকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ। বিধিমালাটি গ্রহণ না করে কিছু শব্দ ও বিধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এসকে সিনহা। এরপর ওই খসড়া সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্ট আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেইসঙ্গে তা চূড়ান্ত করে প্রতিবেদন আকারে আদালতে উপস্থাপন করতে বলা হয়। কিন্তু দফায় দফায় সময় দেওয়া হলেও সরকারের সঙ্গে সর্বোচ্চ আদালতের মতপার্থক্যের কারণে ওই বিধিমালা গেজেট প্রকাশের বিষয়টি ঝুলে যায়। একপর্যায়ে শৃঙ্খলাবিধির সেই খসড়া নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনার মুখে বিচারপতি সিনহা ছুটি নিয়ে দেশ ছাড়েন ও পরবর্তীতে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ঘটনাবহুল পদত্যাগের পর ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞার নেতৃত্বাধীন পাচ বিচারপতির আপিল বিভাগ নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা বিধির প্রকাশিত গেজেট গ্রহণ করে আদেশ দেন। গেজেট গ্রহণের সেই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আট আইনজীবী।
গত বৃহস্পতিবার রিভিউ শুনানিতে রিভিউ শুনানিতে আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুনানিতে বলেছি বিচার বিভাগকে ‘অ্যাসল্ট করে’ এই শৃঙ্খলাবিধিকে গ্রহণ করা হয়েছিল ততকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে। কারন, তার আগে নয়জন বিচারপতি এবিষয়ে ভিন্ন আদেশ দিয়েছিলেন। এটি বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে তৎকালীন সরকার বাধ্য করেছিল নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নের গেজেট সংক্রান্ত আদেশ দিতে। এটি দ্রুত রিভিউ করা প্রয়োজন বলেই আদালতের অনুমতি নিয়ে রিভিউটি করা হয়।’







