রাজধানীর শাহজাহানপুরের গুলবাগে যুবলীগ নেতা অলিউল্লাহ রুবেল খুনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় হাবিব আহসান নামের এক আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। একই মামলায় গ্রেপ্তার অন্য সাত আসামির চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
অলিউল্লাহ’র হত্যাকাণ্ডের পর তার স্ত্রী তানজিনা বাদী হয়ে শাহজাহানপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর ডিএমপির মতিঝিল বিভাগ (ডিবি) আটজনকে ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন-র্যাব তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।
রিমান্ডে নেওয়া আসামিরা হলেন-আলিফ হোসাইন (২১), রবিউল সানি (২১), মেহেদী হাসান (১৯), মো. শাহজালাল (৩৭), রফিকুল ইসলাম (৩৮), নুর আলম (৪২) ও সুমন মীর (২৮)।
রোববার ২৩ জুলাই তাদের আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর আসামি হাবিব আহসান সেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. মোশাররফ হোসেন তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
অন্যদিকে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বাকি সাত আসামিকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সুলতান সোহাগ উদ্দিনের আদালত তাদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে শনিবার ২২ জুলাই দিনগত রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার ডিবি মতিঝিল বিভাগ।
বাজার-ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণের জেরে খুন রুবেল
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হারুন জানান, শাহজাহানপুরে বাজার ও ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণসহ এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যুবলীগ নেতা রুবেলকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন এলাকার স্থানীয় চাঁদাবাজ শাহজালাল ও নিবিড়। অলিউল্লাহর সঙ্গে এ দুজনের বিরোধ হয়েছিল। শাহজালালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ২৫টিরও বেশি মামলা রয়েছে।
খুনের জন্য চাপাতি কিনতে খরচ ৪ হাজার
হারুন বলেন, রুবেলকে হত্যার জন্য গ্রেপ্তার হাবিবকে ঠিক করেছিলেন শাহজালাল ও নিবিড়। চাপাতি কেনার জন্য হাবিবকে ৪ হাজার টাকা দিয়েছিলেন নিবিড়। সে মোতাবেক খিলগাঁও বাজার থেকে দুটি চাপাতি কেনেন তিনি। ঘটনার আগের দিন শাহজালাল ও হাবিব মিলে রুবেলকে হত্যার পরিকল্পনা সাজান।ঘটনার দিন অনন নামে এক যুবক ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল নিয়ে রুবেলের গতিবিধি রেকি করেন। পরে রুবেল রিকশাযোগে বাসার দিকে রওনা হলে অনন খবরটি হাবিবকে জানান। খবর পেয়ে হাবিব ও আলিফ চাপাতি নিয়ে রুবেলের বাড়ির সামনে অবস্থান নেয়। রাস্তার দুই পাশে পাহারায় থাকেন মেহেদি হাসান ও সানি। রুবেলকে রিকশাযোগে আসতে দেখে হাবিব ও আলিফ চাপাতি নিয়ে এগিয়ে যান। ঘটনা আঁচ করতে পেরে দৌড়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন রুবেল। পেছন থেকে তাকে হাবিব ও সেলিম ধাওয়া করেন।
ডিবি প্রধান বলেন, এ ঘটনায় আর কে কে জড়িত, সে সম্পর্কে পুলিশের এ কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি বলেন, আমাদের তদন্ত চলছে।কয়েকজন পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান চলছে।
যা বলছে র্যাব
র্যাব বলছে, পানির ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চেষ্টা করছিলেন যুবলীগ নেতা রুবেল। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে নিয়ে শাহজালাল নামের ব্যক্তির সঙ্গে তার শত্রুতার তৈরি হয়। এরপর উচিত শিক্ষা দিতে যুবলীগ নেতাকে হত্যা করা হয়।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে রোববার সংবাদ সম্মেলনে দুইজনের গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানান র্যাব-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, হত্যার শিকার অলিউল্লাহ রুবেল রাজধানীর শাহজাহানপুরে সপরিবারে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। শান্তিবাগ এলাকায় ইন্টারনেট ও ডিমের পাইকারি ব্যবসা করতেন তিনি। সম্প্রতি ওই এলাকায় পানির ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চেষ্টা করছিলেন। মূলত স্থানীয় এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের জের ধরে শাহজালাল নামক ব্যক্তির সঙ্গে তার শত্রুতা তৈরি হয়। এর জেরে তাকে হত্যা করা হয়।শাহজালালের নির্দেশেই হাবিব ও তার সহযোগীরা রুবেলকে হত্যার পরিকল্পনার করে। আর গ্রেপ্তার শাকিল ও আসিফ হত্যাকাণ্ডে হাবিবকে তথ্য প্রদান করে।
গ্রেপ্তারদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক জানায়: মূল পরিকল্পনাকারী শাহজালালের পরিকল্পনাতেই এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে। শাহজালালের সাথে স্থানীয় এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রুবেলের বিরোধ সৃষ্টি হয়। এতে শাহজালাল ক্ষিপ্ত হয়ে রুবেলকে হত্যার জন্য হাবিবকে দায়িত্ব দেয়। এরই জের ধরে হত্যাকারীরা রুবেলকে হত্যার নীলনকশা সাজায় এবং সে অনুযায়ী নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি সম্পন্ন করে।
তিনি বলেন, শাকিল ও আসিফ ঘটনাস্থলে সক্রিয় অংশগ্রহণের পর দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে নিজ নিজ বাসায় চলে যায়। শাকিল ও আসিফ পরদিন টঙ্গিতে শাকিলের এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে গা-ঢাকা দেয় এবং অন্যান্যরা কুমিল্লার দিকে পালিয়ে যায় বলে এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে বলেও জানান র্যাবের এই কর্মকর্তা।
গত বৃহস্পতিবার ২০ জুলাই রাত সোয়া ১টার দিকে শাহজাহানপুরের গুলবাগ জোয়ারদার লেনে দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার ওপর ফেলে রেখে যায়। পরে খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।








