ফিফা র্যাংকিংয়ের ৮৭ তে থাকা জর্ডান এশিয়ান কাপ ফুটবলের ১৮তম আসরের ফাইনালে উঠে আগেই এক নতুন ইতিহাস গড়েছে। আজ সেই ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ তাদের সামনে। এশিয়ান কাপের চমক জাগানো জর্ডান রাত ৯টায় ফাইনালে গতবারের চ্যাম্পিয়ন দল কাতারের মুখোমুখি হবে।
কাতারের সবচেয়ে নান্দনিক বড় লুসেইল স্টেডিয়ামে ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। এ স্টেডিয়ামেই ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর সর্বশেষ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এবং ফ্রান্সের মধ্যকার ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হবে। জর্ডান প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপ ফুটবলের ফাইনালে উঠলেও এর আগে কাতার দুবার (১৯৮৮ এবং ২০১১) এশিয়ান কাপ ফুটবলের জয়ী দল। এ ছাড়া ২০২২ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের মধ্যে দিয়ে এই দেশের ফুটবল সামর্থ্য নিয়ে নতুন কিছু বলা অনর্থক। ফিফা র্যাংকিংয়েও কাতার (৫৮) জর্ডান (ফিফা র্যাংকিং ৮৭) থেকে অনেক এগিয়ে।
তবে সেই কাতারের সামনে নতুন ইতিহাস লেখার অভিপ্রায়ে উজ্জীবিত এক দল জর্ডান। কাতারকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নে এই দেশটি এখন বিভোর। জর্দানের মরোক্কান কোচ হুসেইন আম্মুতা তাই যেনো এক নতুন স্বপ্নের মাঝে ডুবে আছেন। এই ম্যাচ নিয়ে ভীষণ রকম আশাবাদী তিনি। সব চ্যালেঞ্জ পেছনে ফেলে এই টুর্নামেন্টে যে উচ্চতায় তিনি দলকে নিয়ে এসেছেন, তার পরিপূর্ণতা দিতে চান। আর সেটা দিতে পারলেই জর্ডান এশিয়ান ফুটবলে এক নতুন ইতিহাস গড়তে সক্ষম হবে।
কোচ হুসেইন আম্মুতা বলেছেন, আজ ফাইনাল ম্যাচ আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই ম্যাচের জন্য আমরা আলাদা কোনো প্রস্ততি বা কৌশল নিচ্ছি না। একবারেই অন্য ম্যাচের মতো করে নিয়েছি। কোনোভাবেই আমরা আলাদা করে মানসিক চাপও নিচ্ছি না। আমরা যে মাপের খেলা উপহার দিয়ে এই পর্যন্ত উঠে এসেছি, সেই খেলাই আমরা ফাইনালে উপহার দিতে চাই।
তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত যা পেয়েছি তাতে আমরা খুবই খুশি। আসলে জর্ডানকে নিয়ে আমার এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল আমি সেই চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়েছি। ফাইনালে আমাদেরকে খেলতে হচ্ছে কাতারের মাঠে চ্যাম্পিয়ন কাতারের সাথে। তবে এতে আমরা ভীত নই। আমরা ফাইনালে একতাবদ্ধ, আমরা আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও আরও সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।
জর্ডানের এর আগে এশিয়ান ফুটবলের লড়াইয়ের সফরে এমন মধুরতম কোনো স্মৃতি নেই। সবারই ধারণা ছিল, চৌকষ দল সাউথ কোরিয়ার সামনে সেমিফাইনালেই থমকে যাকে তারা। শক্তিশালী দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে কোনোভাবেই তারা পেরে উঠবে না।
কিন্তু ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম সেমিফাইনালে ২-০ গোলে সাউথ কোরিয়াকে পরাজিত করে এশিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের ফাইনালে উঠে সবাইকে চমকে দেয় জর্ডান। সাউথ কোরিয়া সব দিক দিয়েই এগিয়েছিল। ইউরোপিয়ান লিগে খেলা তারকাতে ঠাঁসা ছিল তাদের দল। কৌশলে ও সামর্থ্যে কোচ জার্গেন ক্লিন্সম্যানের দলটি ছিল আত্মবিশ্বাসীও।
কিন্তু জর্ডান সেদিন গতিময় ফুটবল উপহার দিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয়। সাউথ কোরিয়া এভাবে হেরে যাবে সেটা ছিল কল্পনারও বাইরে। বল দখলে কোরিয়াই এগিয়ে ছিল। কিন্তু সুযোগের শতভাগ ব্যবহারে জর্ডান ছিল এগিয়ে। আর তাইতো আল নিয়ামত এবং মুসা আল তামারির চৌকষ ফিনিশিংয়ের কারণে জর্ডান ম্যাচ করায়ত্ত করতে সক্ষম হয়। শেষে কোরিয়া শত চেষ্টা করেও গোলের সন্ধান না পেলে ঐতিহাসিক এক জয়ের মধ্যে দিয়ে নিজেদের নাম খোদাই করতে সক্ষম হয়।
এর আগে গ্রুপ ‘ই’-তে জর্ডানের প্রতিপক্ষ ছিল মালয়েশিয়া, সাউথ কোরিয়া এবং বাহরাইন। ১৫ জানুয়ারি প্রথম ম্যাচে জর্ডান মালয়েশিয়াকে হারিয়েছিল ৪-০ গোলের ব্যবধানে। পরের ম্যাচে সাউথ কোরিয়ার সাথে ২-২ গোলে ড্র করে।
এরপর ২৫ জানুয়ারি মাসে বাহরাইনের কাছে ০-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয়। কিন্তু মূল চমকটা দেয়া তারা দ্বিতীয় রাউন্ডেই। ২৯ জানুয়ারি এবারের এশিয়ান কাপের অন্যতম ফেভারিট এবং শক্তিশালী দল ইরাককে ৩-২ গোলে পরাজিত করে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে আসে। এরপর ২ ফেব্রুয়ারি কোয়ার্টার ফাইনালে তাজিকিস্তানকে পরাজিত করে জর্ডান সেমিফাইনালে পা রাখে।
জর্ডানে রয়েছে বেশ কিছু চৌকষ ফুটবলার। এর মধ্যে ১০ নম্বর জার্সিধারী মধ্যমাঠে খেলা বাম পায়ের মুসা সোলায়মান আল তামারি সবচেয়ে ভয়ংকর। ফ্রান্স লিগে খেলা তামারি চমৎকার ড্রিবলিং করতে জানেন। সব ম্যাচেই তিনি ভালো খেলেছেন। আজকেও তিনি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবেন এটি আগাম বলা যায়। মুসার সাথেই দেখা যাবে স্ট্রাইকার ইয়াজান আল নিয়ামতকে। তবে কাতারের জন্য আজ অনেক প্লাসপয়েন্ট রয়েছে। প্রথম নিজ দেশের পরিচিত ভেন্যুতে খেলা।
দ্বিতীয় দর্শকদের সমর্থনও তারা পাবেন। কাতারের কোচ আজকের ম্যাচ নিয়ে কোনো দম্ভ প্রকাশ করেননি। বরং তিনি নমনীয় কণ্ঠে বলেছেন, ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী দুই দেশ আজ ফাইনালে খেলবে। আমাদের কাজ চ্যাম্পিয়ন হওয়া। মাথার উপর বাড়তি কোনো চাপ নেই। আমরা আমাদের পূর্ণশক্তি নিয়ে লড়াই করব। তবে কাতার ফুটবল দলের অধিনায়ক হাসান আল হেদস বলেছেন, আমরা সর্বশেষ প্রীতি ম্যাচের কথা স্মরণ করছি। ২০১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর ওই ম্যাচে কাতার ২-০ গোলে জয়ী হয়েছিল।
কাতারকে হারানোর স্মৃতি রয়েছে জর্ডানের, আজ থেকে ১৫ বছর আগে। ২০০৮ সালে জর্ডান ওয়েস্ট এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন চ্যাম্পিয়নশিপে হারিয়েছিল কাতারকে। এরপর আর হারাতে পারেনি। হয়তো আজ নতুন ইতিহাস জর্ডান লিখতেও পারে। লুসেইল স্টেডিয়ামে আজ উপচে পড়া সমর্থন নিয়ে তারা লড়াই করবে এক অনন্য ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে।








