বাংলাদেশের প্রথম মহাকাশচারী হবার জন্য নিচ্ছেন প্রস্তুতি, দিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ঘুরে ঘুরে বিজ্ঞান বিষয়ক সেমিনারে বক্তব্য। শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠন ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে দেশ গঠনে অবদান রাখার মন্ত্রণাও তার মুখে। তিনি শাহ জালাল জোনাক। গণমাধ্যমের কোন প্রতিবেদন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে অনেকেই জেনেছেন ‘মেধাবী’ এ তরুণকে।
শাহ জালাল জোনাক প্রসঙ্গে এতো প্রশস্তি চ্যানেল আই অনলাইনকেও উদ্বুদ্ধ করে তাকে নিয়ে একটি তথ্যবহুল প্রতিবেদন প্রকাশ করতে। কিন্তু খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে বিভ্রান্ত হবার মতো পরিস্থিতি। জোনাকের বিশ্ববিদ্যালয় বাউমান মস্কো স্টেট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি, রাশিয়া থেকে জানা যায়: প্রস্তুতিমূলক কোর্সগুলো পাশ করলেও আন্ডার গ্রাজুয়েশন লেভেলে রকেট কমপ্লেক্স অ্যান্ড স্পেস সায়েন্স প্রথম বর্ষে ১১টি আলাদা আলাদা বিষয়ের কোনটিতেই পাশ করতে পারেননি তিনি। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় তার ছাত্রত্ব বাতিল করেছে।
আসলেই কি তাই? আরও নিশ্চিত হতে বাউমান মস্কো স্টেট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি’র কয়েকজন শিক্ষার্থী- যারা বাংলাদেশ থেকে স্কলারশিপ নিয়ে সেখানে পড়াশোনা করছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারাও একইরকম তথ্য জানান। জোনাকের পড়াশোনার সর্বশেষ স্ট্যাটাস এমন হবার পরও জোনাক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেকে নিয়ে যে আত্মপ্রচার চালাচ্ছেন, তা সেখানকার ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে বলে জানান তারা।
এর মধ্যে জোনাকের স্টুডেন্ট প্রোফাইল আসে আমাদের হাতে, যা এতোদিনের অভিযোগগুলোকে আরও দৃঢ় করে। সবশেষ বাউমান মস্কো স্টেট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ই-মেইল যোগে কথা বলে চ্যানেল আই অনলাইন। জানতে চাওয়া হয় শাহ জালাল জোনাকের পড়াশোনা এবং ছাত্রত্ব বাতিলের সত্যতা প্রসঙ্গে। ১৩ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডমিশন অফিসে বরাবর ই-মেইলটি পাঠানো হয়।
মেইলের জবাব আসে ২১ জুন। ডিপার্টমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্টিফিক অ্যাডুকেশনাল কোঅপারেশন ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সেবা বিভাগের ডেপুটি হেড ইয়াকোলেভ কনস্ট্যান্টিন মেইলের জবাব দেন।

সেখানে ইয়াকোলেভ জানান: জোনাক ২০১৮ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিয়া সরকারের স্কলারশিপে রকেট কমপ্লেক্স অ্যান্ড স্পেস সায়েন্স বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পান। মোট পাঁচ বছরের প্রোগ্রামের প্রথম বছর প্রস্তুতিমূলক কোর্স হিসেবে ধরা হয়, যা ২০১৯ সালে জোনাক সফল ভাবে সম্পন্ন করেন। পরবর্তী চার বছর মূল আন্ডারগ্র্যাজুয়েট লেভেলে তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় সেমিস্টারের কোন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি, ১১টি বিষয়ের মধ্যে সবকটিতে অকৃতকার্য হন। এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় দফায় জোনাককে একাডেমিক সুযোগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় যেন তিনি পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারেন।
ইয়াকোলেভ আরও জানান: জোনাক ক্লাসে উপস্থিত থাকতেন না। কোন ব্যবহারিক কাজ করতেন না। মূল পড়াশোনার বাইরে পার্সোনাল কাজ ও এক্সট্রা কারিকুলারে বেশী মনেযোগী ছিলেন। আমরা অবশ্যই এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিজকে স্বাগত জানাই। কিন্তু তা অবশ্যই মূল পড়াশোনার ক্ষতি না করে।
যদিও জোনাক চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে দাবি করেন: তিনি তৃতীয় বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে চলতি বছর এপ্রিলে বাংলাদেশে আসেন। চতুর্থ বর্ষের সপ্তম সেমিস্টারের ক্লাস শুরু করতে আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে রাশিয়া যাবেন। তিনি দাবি করেন ২০২৪ সালে গ্র্যাজুয়েট হবেন!
কিন্তু ইয়াকোলেভ জানিয়েছেন: প্রথম ও দ্বিতীয় সেমিস্টারে কৃতকার্য হতে না পারায় এবং পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ পাওয়ার পরও কোন কোর্স সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে।

বাউমান মস্কো স্টেট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে প্রোপার চ্যানেলে ই-মেইলটির উত্তর এসেছে জানালে জোনাক দাবি করেন: রকেট সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা জিও পলিটিক্সের বড় একটা অংশ। সিকিউরিটি মেইন্টেইন করার জন্য তারা এমন রিপ্লাই করে।
অবশ্য তিনি ফেসবুকে পেজ খুলে পড়াশোনা প্রসঙ্গে যে প্রচার চালাচ্ছেন তাতে সিকিউরিটি মেইন্টেইনের জন্য কোন সমস্যা হয় না বলে দাবি করেন তিনি।
তার কোন রেজাল্ট অনলাইন যোগে আমাদের দিতে পারবেন কিনা জানতে চাইলে জোনাক বলেন: তাদের সকল রেজাল্ট কাগজে কলমে হয়। অনলাইনে কোন রেজাল্ট দেখার সুযোগ নাই। তিনি রাশিয়ায় যাবার পর আমাদের রেজাল্ট শিট দেখাতে পারবেন।
বাউমান মস্কো স্টেট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অবশ্য জানান: বাউমান স্টেট ইউনিভার্সিটি এতো ব্যাকডেটেড ইউনিভার্সিটি না যে শুধু কাগজে কলমে বা ফিজিক্যালি রেজাল্ট দেওয়া হয়। আমাদের চার থেকে পাঁচটা রেজাল্ট রেকর্ড থাকে। এর মধ্যে একটা স্টুডেন্ট প্রোফাইল, যেটা অনলাইনে। সেখানে ফার্স্ট সেমিস্টার থেকে লাস্ট সেমিস্টার পর্যন্ত রেজাল্ট কী, কোন অ্যাসাইমেন্ট দেওয়া হলো আর কোনটা দেওয়া হলো না সব রেকর্ড থাকে। বিশ্বের যেকোন জায়গা থেকে সেটি লগইন করা সম্ভব।

১১ জুলাই চ্যানেল আই ছাদ বারান্দায় জোনাকের ইন্টারভিউয়ে রাশিয়ান ভাষায় আমাদের কাছে থাকা ই-মেইল দেখানো হয়।তখন তিনি আমাদের জানান: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনি আমাদের সিসিতে রেখে বাউমান মস্কো স্টেট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে ই-মেইল করবেন। আমাদেরকে তাদের দেওয়া উত্তরের চ্যালেঞ্জ জানাবেন। কিন্তু ১২ দিন পেরোলেও তিনি তা করেননি। উল্টো ২০ জুলাই বৃহস্পতিবার তাকে ফোন করে ই-মেইল না করার কারণ জানতে চাইলে, তিনি আজই করবেন বলে জানান। যা দু’দিন পেরোলেও তিনি তা করেননি।
অন্যদিকে স্পেস স্যুট পরিহিত জোনাকের যে ছবি তিনি তার ফেসবুক প্রোফাইলে ব্যবহার করেন সেটি তিনি রাশিয়া থেকে কিনে এনেছেন এবং যে কেউ চাইলে এটা কিনতে পারে বলে জোনাক জানান।







