বিশ্ব ফুটবলে ‘ব্লু সামুরাই’ বলে খ্যাত জাপান বিশ্বকাপ ফুটবলে নতুন কাব্য লিখতে না পারলেও সেই কাব্য লিখতে পেরেছে প্যারাগুয়ে এবং মরক্কো। জাপান ব্রাজিলের কাছে ২-১ গোলে পরাজিত হলেও বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট জার্মানিকে পেনাল্টি শুট আউটে হটিয়ে দিয়েছে ফুটবলের তুলনামূলক খর্বশক্তির প্যারাগুয়ে। অন্যদিকে ডাচদের হারিয়েছে মরক্কো। দুটি ম্যাচই পেনাল্টি শুট আউটে ফয়সালা হয়।
প্যারাগুয়ের কাছে হেরে টপফেভারিট জার্মানিকে বিশ্বকাপ থেকে অশ্রসিক্ত নয়নে বিদায় নিতে হয়েছে। বিশ্বকাপের উত্তেজনাময় লড়াইয়ে এক বড় অঘটন। পেনাল্টি শুট আউটের সাডেন ডেথে জার্মানির জনাথন টাই বল বারের উপর দিয়ে উড়িয়ে মারলেও আর্জেন্টিনার লিগে নিয়মিত খেলা প্যারাগুয়ের সেন্টারব্যাক হোসে ক্যানালে নির্ভুল নিশানা করতে ভুল করেননি। তবে প্যারাগুয়ের গোলকিপার অরল্যান্ডো গিলকে মহানায়ক বলা যেতে পারে। টাইব্রেকারে জার্মানির দুটি শট ঠেকিয়েছেন বড় আত্মবিশ্বাসের সাথে। ম্যাচে ৪২তম মিনিটে প্রথম গোল করে প্যারাগুয়ের এনসিসো। আর ৫৪তম মিনিটে তা শোধ করে জার্মানির কাই হাভার্টজ। এমনতরো পরাজয়ের পর জার্মানির কোচ ক্ষোভ প্রকাশ না করে পারেননি। বলেছেন, জার্মানি এখন আর প্রথম সারির কোন ফুটবল দল নয়। এদিকে প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক জয়ের পর সেদেশের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা একদিনের জন্য জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, এই বিজয় জনগণের দৃঢ়তা, বিশ্বাস এবং শান্তির বার্তা।
এদিকে ব্রাজিল ও জাপানের ম্যাচ নিয়ে নানা দোলাচল থাকলেও শেষ মুহূর্তের যোগ করা সময়ে ব্রাজিলের গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির গোলে ম্যাচের ফয়সালা হয়ে যায়। ব্রাজিল ২-১ গোলে জয় নিয়ে ষোলোতে পৌঁছে গেছে। ব্রাজিলের খেলার শেষ লগ্নে গোল করার কারণে জাপান আর ফিরে আসার সুযোগ পায়নি। এই পরাজয়ের পর জাপান বলেছে, এটি সেই হৃদয়ভঙ্গ, যা আবারও দেখতে হল। বিশ্বকাপের পাঁচ আসরে খেলা জাপান নকআউট পর্বে এপর্যন্ত কখনই জয়লাভ করতে পারেনি। তাই অসীম দুঃখ। এর আগে হারতে হয়েছে তুরস্ক ( ২০০২), প্যারাগুয়ে ( ২০১০, পেনাল্টি শুট আউটে), বেলজিয়াম (২০১৮), ক্রোয়েশিয়া ( ২০২২, পেনাল্টি শুট আউটে) এবং সর্বশেষ ব্রাজিল। সেই বেদনার আক্ষেপে আবারও পুড়তে হল নিশিথ সূর্যোদয়ের এই দেশটিকে।
সাবেক তারকা ফুটবলার ইকবাল হোসেন বলছিলেন, ‘ব্রাজিল নিঃসন্দেহে ভালো খেলেই জিতেছে। শেষ মুহূর্তে ব্রাজিল জয়সূচক গোলটি করতে পারার কারণে ম্যাচটি আর প্রলম্বিত হয়নি। সেটা হলে আবার অনেককিছুই ভাগ্যের উপর নির্ভর করত। তখন নানারকম অনিশ্চয়তাও এসে ভর করত। ব্রাজিল শেষমেশ ভালোয় ভালোয় ফিনিশিং দিয়ে ষোলোতে পৌঁছোতে পেরেছে।’
জার্মানি এবং প্যারাগুয়ের মধ্যেকার ম্যাচে জার্মানির পরাজয়কে খানিকটা আকস্মিক মনে করছেন ইকবাল। তার মতে, ‘বিশ্বকাপে জার্মানি বরাবরই আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী দল হিসেবে পরিচিত। তাদের মানসিক দৃঢ়তা অনুকরণীয়। কিন্তু প্যারাগুয়ে আচমকা একটা ঘটনা ঘটিয়ে দিল। বিশ্বকাপ থেকে জার্মানির দ্রুত চলে যাওয়ায় বিশ্বকাপের জৌলুসও একটু কমে গেল। তবে নতুনদের খেলা আরও উপভোগ্য হবে।’
ইকবাল হোসেন নব্বই দশকে ঢাকার মাঠ মাতানো ফুটবলার। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খ্যাত ছিলেন। জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন টানা দশ বছর। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে বাফুফের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অনেকদিন ধরে। জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন সময়ে। বর্তমানে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের এক নম্বর সদস্য। ইকবাল মনে করেন এবার বিশ্বকাপের দাবিদার শুধু ব্রাজিল, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনাই নয়। এবারের বিশ্বকাপ ট্রফির দাবিদার ফুটবলের অন্যতম শক্তি মরক্কোও।
তার মতে, মরক্কো লড়াকু দল। তাদের খেলার গতি ও স্টাইল বৈচিত্র্যময়। দুপাশ থেকেই দুর্দান্ত আক্রমণ করতে পারে। শেষ পর্যন্ত লড়তে পারে। খেলোয়াড়দের দম অফুরন্ত। ইকবাল বললেন, ‘একটি পরিপূর্ণ দল হল্যান্ড। খুবই ভালো খেলছিল এই দলটি। ইউরোপের লিগে খেলা সেরা সেরা ফুটবলাররা রয়েছে এই দলে। তাদের কাছ থেকে জয় ছিনিয়ে নিয়ে এই মরক্কো প্রমাণ করেছে- তাদের সামনে এখন কোন দলই আর নিরাপদ নয়।’
ইকবালের প্রিয় দল ব্রাজিল। খেলোয়াড় থাকার সময়ে বড় বেশি পছন্দ করতেন ব্রাজিলের রোনালদিনহো এবং কাকাকে। এবারের চ্যাম্পিয়নের পথে তিনি এগিয়ে রাখছেন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও মরক্কোকে। তবে রাতে ডালাসে নরওয়ে এবং আইভরি কোস্টের ম্যাচে এগিয়ে রাখছেন নরওয়েকে। আর শেষরাতে নিউজার্সিতে সুইডেনের বিপক্ষে ফ্রান্স জিতবে বলেই তিনি বিশ্বাস করেন।








