প্রচণ্ড গরমে কর্মীদের স্বস্তি দিতে অফিসে পুরুষদের শর্টস পরে আসতে উৎসাহ দিচ্ছে জাপানের রাজধানী টোকিও। তবে এই উদ্যোগ ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই এটিকে স্বাগত জানালেও কিছু নারীর অভিযোগ, পুরুষ সহকর্মীদের খোলা পায়ের লোম দেখতে বাধ্য হওয়া এক ধরনের ‘পায়ের লোম হয়রানি’।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে টোকিওর গভর্নর ইউরিকো কোইকে ‘টোকিও কুল বিজ’ কর্মসূচি চালু করেন। এর আওতায় কর্মীদের প্রচলিত স্যুট-টাইয়ের পরিবর্তে টি-শার্ট, স্নিকার্স এবং শর্টসসহ আরামদায়ক পোশাক পরতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। প্রায় চার মাস পর এই নীতির প্রভাব নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
অনেক কর্মী মনে করছেন এই পোশাকবিধি গরমে কাজ করা সহজ করেছে। তবে সমালোচকদের মতে, নীতিটি নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে সমান নয়। কারণ নারীরা পা খোলা রাখলেও এখনও অনেক কর্মক্ষেত্রে তাদের স্টকিংস বা টাইটস পরার সামাজিক চাপ রয়েছে।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সুনেহারা’ নামে একটি শব্দও ছড়িয়ে পড়েছে। ‘লেগ হেয়ার হ্যারাসমেন্ট’ বা পায়ের লোমজনিত অস্বস্তি বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু নারী বলছেন, সহকর্মীদের পায়ের লোম দেখতে বাধ্য হওয়া তাদের জন্য বিব্রতকর।
টোকিও মেট্রোপলিটন সরকারের পরিবেশবিষয়ক কর্মকর্তা নোবোরু ওয়াতানাবে বলেন, আমরা কাউকে কী পরতে হবে তা বলে দিতে চাই না। তীব্র গরমে মানুষকে আরও বেশি পোশাকের বিকল্প দিতে চাই। যতক্ষণ পোশাক অন্যদের কাছে আপত্তিকর না হয়, ততক্ষণ এতে সমস্যা থাকার কথা নয়।
জুন মাসে গরিলা ক্লিনিকের এক জরিপে দেখা যায়, গ্রীষ্মে অফিসে শর্টস পরার পক্ষে ছিলেন ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বিপক্ষে ছিলেন ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
জরিপ অনুযায়ী, শর্টসের বিরোধিতার প্রধান কারণ ছিল শরীরের গঠন এবং পায়ের লোম নিয়ে অস্বস্তি। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে পুরুষ সহকর্মীদের খোলা পা দেখার বিষয়ে অনীহা তুলনামূলক বেশি ছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে জাপানি কর্মীদের মধ্যে নৈমিত্তিক পোশাক পরার প্রবণতা বেড়েছে। তবে এবার টোকিও সরকারের সুপারিশের পর বিষয়টি আরও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। তবুও অনেক পুরুষ নিজের পায়ের লোম নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগছেন।
গরিলা ক্লিনিকের পরিচালক আকিফুমি ফুনাৎসু জানান, শুধু সৌন্দর্যচর্চার জন্য নয়, বরং শর্টস পরার সময় সামাজিক শিষ্টাচারের বিষয় বিবেচনা করেও এখন অনেক পুরুষ লেজার হেয়ার রিমুভাল করাতে আসছেন। তার মতে, অনেক নারী মনে করেন পুরুষদের পায়ের লোম কম থাকা উচিত এবং এই ধারণাই অনেককে লোম অপসারণে উৎসাহিত করছে।
ইউরিকো কোইকে প্রথম ‘কুল বিজ’ কর্মসূচি চালু করেন ২০০৫ সালে, যখন তিনি জাপানের পরিবেশমন্ত্রী ছিলেন। জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে তখন কর্মীদের ছোট হাতার শার্ট পরতে উৎসাহ দেওয়া হয়। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমিও জনসমক্ষে টাই ও জ্যাকেট ছাড়া উপস্থিত হয়ে প্রচারণায় অংশ নেন।
পরে ২০১১ সালের তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামির পর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ‘সুপার কুল বিজ’ কর্মসূচি চালু করা হয়। এতে কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও কম বিদ্যুৎ ব্যবহার উৎসাহিত করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জাপানেও রেকর্ড তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে। দেশটির আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, এ গ্রীষ্মে চরম তাপদাহ হতে পারে। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে তারা ‘কোকুশো-বি’ বা ‘অত্যন্ত তপ্ত দিন’ শব্দটি ব্যবহার করছে।
জাপানের ফায়ার অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির সর্বশেষ সাপ্তাহিক তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে হিটস্ট্রোকে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪ হাজার ৫৮০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সরকার নাগরিকদের পর্যাপ্ত পানি পান এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে। পাশাপাশি বিল্ট-ইন ফ্যানযুক্ত পোশাক, ভেজা তোয়ালে, অতিবেগুনি রশ্মি ও তাপ প্রতিরোধী ছাতা এবং বহনযোগ্য হাতপাখার মতো পণ্যের চাহিদাও বেড়েছে।
জাপান অ্যাকাডেমিক নেটওয়ার্ক ফর ডিজাস্টার রিডাকশনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরকে অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। তাই পূর্ণমাত্রার গ্রীষ্ম শুরু হওয়ার আগেই বর্ষাকালে গরমের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এবং হিটস্ট্রোক প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
তারা আরও বলেন, জাপানের উচ্চ আর্দ্রতার কারণে ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।







