বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রায় আট দশকের ঘটনাপ্রবাহ আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছে জামায়াতে ইসলামী। তবে রাজধানীর মিন্টো রোডে দলটির আয়োজিত প্রদর্শনীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা থাকলেও ওই সময় জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ভূমিকার কোনো উল্লেখ নেই। বিষয়টি নিয়ে দর্শনার্থী ও সমালোচকদের মধ্যে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) শেষ হয়েছে চার দিনব্যাপী এ প্রদর্শনী। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত প্রদর্শনীর নাম ‘জুলাই এখনও শেষ হয় নাই’। এতে শতাধিক আলোকচিত্রের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, পাকিস্তানি শাসন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, শেখ হাসিনার শাসনামল এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ছবি স্থান পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অংশে ৭ মার্চের ভাষণ, যুদ্ধের বিভিন্ন মুহূর্ত, বিজয়ের ছবি এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের দৃশ্য রাখা হয়েছে। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান কিংবা দলটির তৎকালীন নেতাদের ভূমিকা নিয়ে কোনো ছবি বা তথ্য রাখা হয়নি। এ নিয়ে সমালোচকদের প্রশ্ন, পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হিসেবে প্রদর্শনীতে স্থান পায়, তাহলে সেই সময়ের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও ভূমিকা কেন তুলে ধরা হলো না।
প্রদর্শনীতে স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যে তুলে ধরা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলকে ‘একনায়কতন্ত্র’, এইচ এম এরশাদের শাসনকে ‘সামরিক স্বৈরশাসন’ এবং শেখ হাসিনার শাসনামলকে ‘ফ্যাসিবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকার ও তার সময়কার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহও প্রদর্শনীতে দেখা যায়নি। প্রদর্শনী দেখতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও এ নিয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মিরপুর থেকে আসা ফয়েজ বলেন, জামায়াত ইতিহাস বিকৃত করলে দেশের সচেতন মানুষও তাদের ইতিহাস থেকে বাদ দেবে।
মুসফিকা তাসনীম নামে এক দর্শনার্থী বলেন, প্রদর্শনীতে কিছু বিষয় দেখে তিনি হতাশ হয়েছেন। তবে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করায় তিনি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান। তার মতে, প্রদর্শনীতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইতিহাস থাকলেও উপস্থাপনাটি পূর্ণাঙ্গ নয়। ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা কেন প্রদর্শনীতে রাখা হয়নি, জানতে চাইলে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, একটি প্রদর্শনীর পরিসরে সব ঘটনা তুলে ধরা সম্ভব নয়। মূলত জুলাই আন্দোলনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় ইতিহাসের অনেক ঘটনা এতে স্থান পায়নি। প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো বাছাই করেই প্রদর্শনী সাজানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে জামায়াতের এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও বিশ্লেষক মফিদুল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। সে সময়ের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও ইতিহাসের অংশ হিসেবে আলোচনায় আসা প্রয়োজন।
প্রদর্শনীর বিভিন্ন অংশে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করে নির্দিষ্ট ভাষ্যে তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৪৭ সালের জন্য বলা হয়েছে, স্বাধীনতা এলো, রাষ্ট্র বদলাল না। জুলুমবাজ আইয়ুব ও ইয়াহিয়া খানের উত্থান হলো। ১৯৭১ সালের ক্ষেত্রে প্রদর্শনীতে বলা হয়েছে, ‘দেশ স্বাধীন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না। একনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থান হলো।’ ১৯৭৫ সালের ঘটনাকে বলা হয়েছে, একনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের পতন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না। ১৯৯০ সালের জন্য বলা হয়েছে, ‘গণঅভ্যুত্থানে একনায়ক এরশাদের পতন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না। আর ২০০৯ সালের বয়ানে বলা হয়েছে, ‘নতুন সরকার এলো, রাষ্ট্র বদলাল না। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার উত্থান হলো। ২০২৪ সালের অংশে উঠে এসেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান হলো। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন হলো। আবার ফ্যাসিবাদ?
প্রদর্শনীর শেষ অংশে ‘আমাদেরকে পারতেই হবে, জুলাই এখনও শেষ হয় নাই’ শিরোনামে জামায়াত তাদের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে। সেখানে বাংলাদেশের ইতিহাসকে ‘অসমাপ্ত বিপ্লবের ইতিহাস’ হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময় আন্দোলন-সংগ্রামের পরও রাষ্ট্রকাঠামো ও সংবিধানের মৌলিক সংস্কার না হওয়ায় কর্তৃত্ববাদ ফিরে এসেছে। তাদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এ ধারাবাহিকতা ভাঙার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রদর্শনীর শেষ প্রান্তে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে প্রশ্ন, আমরা কি পারব? তবে পুরো আয়োজনের মধ্যে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ভূমিকার অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইতিহাসের কোন অংশ সামনে আনা হচ্ছে আর কোন অংশ বাদ যাচ্ছে, সেই প্রশ্নে প্রদর্শনীটির নিরপেক্ষতা ও পূর্ণতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।








