বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল সংশ্লিষ্ট সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অসাদাচরণের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন সাবেক ক্রিকেটার জাহানারা আলম। লম্বা সময় ধরে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছেন। প্রায় ৪ বছর আগে বেশ কিছু ঘটনা নিয়ে বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে ম্যানেজার ও নির্বাচক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, নারী বিভাগের প্রয়াত ইনচার্জ তৌহিদ মাহমুদ থেকে শুরু করে কোচদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের বর্ণনা দেন তিনি।
চ্যানেল আই অনলাইনের হাতে এসেছে সেই চিঠি। পাঠকদের জন্য অভিযোগগুলো তুলে ধরা হলো।
চিঠির শুরুতে জাহানারা লিখেছেন, ‘আসসালামু আলাইকুম। আমি জাহানারা আলম, বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের একজন নিয়মিত খেলোয়াড়। আমি জাতীয় দলে ২০০৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নিয়মিত খেলে আসছি। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অধিনায়কত্ব করেছি। বিগত ১৪ বছরে বিভিন্ন ভাল ও খারাপ পরিস্থিতির শিকার হয়েছি। চেষ্টা করেছি খারাপ সময়ে ধরে নিজেকে মানিয়ে নিতে। কিন্তু এখনকার পরিস্তিতি আমাকে করে ফেলেছে। বিগত দিনে বিভিন্ন বিভিন্ন সময়ে আমি আপনার এবং অন্য অনেক কর্মকর্তার শরণাপন্ন ও হয়েছি। আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যে সবসময় আপনাদের সাহায্য পেয়েছি।’
‘বর্তমানে আমার মানসিক অবস্থা এত খারাপ যে, আমি খেলায় মনোযোগ তো দিতে পারছি না, শারিরীকভাবেও অসুস্থতা অনুভব করছি। কিছু বিষয়ে আমি আপনাকে এপ্রিল মাসের ১ তারিখ ফোন কারে জানিয়েছিলাম। সকলবিষয় একসাথে বোঝানোর জন্য পুরোটা লিখে জানাচ্ছি। আমার বিশেষ অনুরোধ, দয়া করে আমার পুরো লেখাটা পড়বেন।’
এরপরই তখনকার কো-অর্ডিনেটর সরফরাজ বাবুর সঙ্গে কী কথা হয়েছিল তা তুলে ধরেন জাহানারা। বলেছেন, ‘সরফরাজ বাবু ভাই আমার সাথে কিছু আলাপচারিতা করে, আমি সিনিয়র এজন্য। কিছু কথার মধ্যে বাবু ভাই বলেন, ‘দেখেন আপা সামনে অনেক বড় টুর্নামেন্ট আমাদের, এক হয়ে খেলতে হবে। টিমে কোনো ঝামেলা থাকলে নিজেরা ঠিক করে ফেলেন। তৌহিদ ভাই অনেক চেষ্টা করেছেন। তৌহিদ ভাই নিজেও খুব চাপে আছে। হয়তো উনি চাকরিও ছেড়ে দিতে পারেন। দলে যদি কোনো ফাটল থাকে তো সিমেন্ট লাগানোর দায়িত্ব আপনাদের সিনিয়রদের। আপনি এটা আবার কারোর সঙ্গে শেয়ার করেন না।’
‘আমি বললাম, তৌহিদ ভাই তো খুব চেষ্টা করেছেন। ভালো মন্দ যাই ফল হোক, উনি কেন চাকরি ছাড়বেন। উনি তো চেষ্টা করছেন। আর দলের মধ্যে সব সমস্যা সম্পর্কে উনি অবগত। সুতরাং উনি চাইলেই নিজেই সব ঠিক করতে পারবেন। আর আমি দলের জন্য সবসময় নিবেদিত প্রাণ। আমার কোনো হেল্প লাগলে বলবেন, আমি তা করতে প্রস্তুত।’
সে ঘটনার পরই টিম ম্যানেজার ও নির্বাচক মঞ্জুরুল খারাপ ব্যবহার শুরু করেন বলে অভিযোগ জাহানারার। লিখেছেন, ‘ পরদিন থেকে মঞ্জু ভাই মাঠে আমার সঙ্গে অকারণে খারাপ ব্যবহার শুরু করেন। খুব চিৎকার এং রূঢ়ভাবে কথা বলেন। আমি হতচকিত, বুঝলাম না আমার দোষটা কোথায়! পরদিন তৌহিদ ভাইকে ফোন করলাম ইন্টারভিউর অনুমতির জন্য। ফোন না ধরায় এসএমএস করলাম, রিপ্লাই পেলাম না। এভাবে চলত থাকল।’
‘একসময় বুঝলাম তারা দু’জনই আমার সাথে মেন্টাল গেম খেলছেন। কারণ শুরুর একমাস মঞ্জু ভাই আমার বোলিং নিয়ে আলাদা ২ দিন কাজ করেছেন। সুন্দর হাসিমাখা মুখে কথা বলতেন, সেই একই লোক হাসি তো বাদ, কথা তো বলেই না বরং চিৎকার করে বাজেভাবে বকা দেয়।’
‘অন্যদিকে তৌহিদ ভাই ফোনও ধরেন না, এসএমএস দেখেন কিন্তু উত্তর দেন না। আমার প্রচুর প্রোগ্রাম, ইন্টারভিউ এর আহ্বান আসে যথারীতি তৌহিদ ভাইয়ের কাছ থেকে অনুমতি নিতেই উনাকে ফোন করি আমি। আগে আমি যখন যে সেময়েই ফোন করেছি, তিনি ফোন ধরে অনুমতিও দিয়েছেন। কিন্তু উনার হঠাৎ এই ব্যবহারে আমি কিছুটা মুষড়ে পড়ি। খোজার চেষ্টা করি আমার অন্যায়, কিন্তু কোন উত্তর পাই না।’
তৃতীয় পৃষ্ঠায় বাংলাদেশ গেমসের দল গঠন থেকে শুরু করে দলের মধ্যে গ্রুপিংয়ের বিষয় তুলে ধরেন জাহানারা। লিখেছেন, ‘রুমানা তখনও ওয়ানডে দলের নিয়মিত অধিনায়ক। বাংলাদেশ গেমসের তিন দলের একটা সালমা আপু, একটা জ্যোতি ও অন্যটায় অধিনায়ক করা হয় শারমিনকে। সেখানে শারমিন কখনো কোনো ঘরোয়া লিগেও অধিনায়কত্ব করেনি। রুমানা এত মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে যে ওই টুর্নামেন্টে সে পারফরম্যান্স করতে পারেনি। ওই টুর্নামেন্ট থেকে আমার, সালমা আপুর ও রুমানার সঙ্গে টেকনিক্যালি খারাপ ব্যবহার শুরু হয় এবং সব জায়গায় জ্যোতির প্রধান্য বাড়তে থাকে।’
‘আমরা সবাই বুঝি এবং জানি যে, একজন কোচ বা ম্যানেজার বা একজন অফিশিয়াল এর পছন্দ একেক রকম। পছন্দের খেলোয়াড় থাকতেই পারে, তার মানে এই নয় যে, পছন্দের খেলোয়াড়কে প্রমোট করার জন্য টিমের মোস্ট সিনিয়র (আমরা তিনজন) অন্য খেলোয়াড়দেরকে টেকনিক্যালি ও মেন্টালি প্রেশার দিবে।’
‘অনুশীলন ম্যাচে নির্বাচক মঞ্জুরুল ইসলামের নির্দেশনা অমান্য করায় বোলিং করতে দেওয়া হয়নি জাহানারাকে। লিখেছেন, ‘আমাদের অনুশীলন ম্যাচে মঞ্জু ভাই আম্পায়ারের ওয়াকিটকিতে বলেন জাহানারাকে ইয়র্কার বল করতে বলো। আমি ইয়র্কার চেষ্টা করে লেগ মিডলে পড়ল। পরের বল গুড লেন্থে হল। আমি কেন উনার কথা শুনিনি তাই আবার ওয়াকিটকিতে অসম্ভব জোরে চিৎকার করে বললেন, খবরদার জাহানারাকে আর যেন বল না দেওয়া হয়। অন্য যে কেউ করবে জাহানারা নয়! সালমা দেখ ব্যাপারটা। মাঠে আম্পায়ারসহ সবাই থ বনে গেছে, আমার চোখে পানি। অথচ আমি ইচ্ছে করে গুড লেন্থে বল করিনাই। আমি তো রোবট নই। উনি আমাকে পরে বুঝিয়ে বলতে পারতেন, এভাবে অপমান না করে।’
চিঠির এক জায়গায় জাহানার লিখেছেন, ‘৩১ মার্চ রাত ১১ টা ৩০ মিনিটে বাবু ভাই আমাকে ফোন করে বলেন কেকের অর্ডার (জাহানারা তার জন্মদিনের কেকের অর্ডার দিয়েছিলেন) বাতিল করতে হবে! অথচ পরবর্তিতে সবার জন্মদিন ভালোভাবে উদযাপন হয়েছে। তৌহিদ ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া মঞ্জু ভাই কোনো কাজ করেন না। অথচ সামনা সামনি দু’জন দুজনের দোহাই দেন। কোবরা টুম্পা, লতা, সুপ্তা মুখ খুলতে ভয় পায়। জ্যোতি, পিংকি ওরা খারাপ সম্পর্ক করবে, উল্টা পাল্টা কাজ করবে এমনকি ছেলে বা মেয়ে কোচের ক্লোজ হয়ে অন্যের নামে কোচদের কান ভারি করবে, ভুক্তভোগী আমি ও আমরা।’
শেষ পৃষ্ঠায় জাহানারা লিখেছেন, ‘আমাকে মানসিকভাবে টর্চার থেকে বাঁচান দয়া করে স্যার, কিভাবে দল গঠন হবে কাকে অধিনায়ক করা হবে, কারা কোচিং স্টাফে থাকবে, কারা অফিশিয়াল থাকবে তা সম্পূর্ণ বিসিবির ব্যাপার। আমি শুধু আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার কিছুটা লিখে জানলাম। আমি শুধু আমার দেশের জন্য পারফর্ম করতে চাই স্যার। এটা কোন অভিযোগ নয় স্যার, এটা একটা নোট। ভবিষ্যতে যদি কোন কঠিন পরিস্থিতি এর কবলে পড়ি, তো আমার বিশ্বাস, আমার বিসিবি অভিভাবক আমাকে সাহায্য করবেন ইনশাআল্লাহ।’
‘একটা বিশেষ অনুরোধ স্যার, যদি কোন খেলোয়াড় বা কোন অফিশিয়াল আমার সম্পর্কে কোন নেগেটিভ কথা বলে তো দয়া করে আমাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করবেন স্যার। আমি সত্য কথা বলব স্যার ইনশাআল্লাহ। আমি সবসময় সৎ থাকার চেষ্টা করি স্যার। অনেক ধন্যবাদ স্যার ধৈর্য্য নিয়ে আমার লেখা পড়ার জন্য। দয়া করে বিষয়গুলি বিবেচনা করে দেখবেন স্যার।’








