ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক। সম্প্রতি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তার মতামত দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহাদাত হোসেন তৌহিদ।
চ্যানেল আই: ইউরোপের নতুন তিনটি দেশসহ জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেড়শ’র মতো দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, ব্যাপারটা কীভাবে দেখছেন?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ে—তিনটি দেশ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্মতি দিলো তাতে প্রথমবার ইউরোপের মধ্যে একটা ভাঙন হলো। কারণ বলতে গেলে ইউরোপ বরাবরই ইসরায়েলের পক্ষে ছিল। দুই রাষ্ট্র (স্পেন, আয়ারল্যান্ড) ফিলিস্তিনের ব্যাপারে চুপ ছিল। নরওয়ের ব্যাপারটা আরও অবাক হওয়ার কথা। দেশটি সব সময় শান্তির পক্ষে অবস্থান নিলেও ওই রাষ্ট্র বা তার প্রতিষ্ঠান অস্ত্র সরবরাহে জড়িত থাকায় এতদিন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীরব ছিল তারা। স্পেন, আয়ারল্যান্ডেরও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি না দেওয়ার কোন কারণ ছিল না। কেননা স্পেনের ইতিহাসের মধ্যেই বড় আকারে এই ধরনের যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান সবসময় ছিল এবং আয়ারল্যান্ড তো নিজেই একটা উপনিবেশ ছিল। আন্দোলন করে তারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইউরোপের মধ্যে এই বিভেদটা বড় একটা বিষয়। এখন দেখা দরকার ইউরোপের অন্য রাষ্ট্রগুলো কী করে। আগে এমন একটা ব্যাপার ছিল যে ইউরোপিয়ানরা কোনভাবেই ইসরায়েলের বিপক্ষে দাঁড়াতে পারতো না। এখন সমস্যার মূলে যেটা রয়ে গেছে সেটা হলো যে ইসরায়েলিরা তো মূলত ইউরোপিয়ান। তাদের যে ভয় তা হলো —আজকে যদি ইসরায়েল না থাকে তাহলে ইসরায়েলের ইহুদিরা তো ইউরোপেই ফেরত যাবে। কারণ তারা ইউরোপ থেকেই এসেছে। তারা যদি ইউরোপে ফেরত যায় তাহলে ইউরোপেই বড় আকারে ইহুদিবিদ্ধেষ তৈরি হবে। যেটা কখনও আরব বিশ্বে ছিল না। এটা বরাবরই ইউরোপে ছিল, ইউরোপেরই সমস্যা। গণহত্যা কিন্তু ওখানেই হয়েছে। সেই হিসেবে আমি মনে করি এটা বড় একটা উন্নতি। এখন দেখা যাক অন্য ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলো কী করে।
চ্যানেল আই: ফিলিস্তিন স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি হলে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত শেষ হবে? যে জেরুজালেম নিয়ে দ্বন্ধ, তার কী হবে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: কয়েকটি দেশের জনগণ যদি বড় আকারে জেগে উঠে। প্রথমত আমেরিকার জনগণকে জেগে উঠতে হবে। আজকে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বা জেরুজালেম তাদের দখলে এনেছে সব সম্ভব হয়েছে আমেরিকার সরকার একেবারে চোখ-নাক বন্ধ করে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছে। আমেরিকার জনগণ যখন জেগে উঠবে তখন আমি মনে করি একটা বড় আকারে পরিবর্তন সম্ভব। ঠিক একইভাবে ইউরোপ ও ইসরায়েলের জনগণকে জেগে উঠতে হবে। এই তিনটা এরিয়ার জনগণ যদি জেগে উঠে তাহলেই কিন্তু সবকিছু সম্ভব। কারণ দ্বি-রাষ্ট্র যদি হতেই হয় সেখানে জেরুজালেমের ব্যাপারে স্পষ্টতই ছিল যে জেরুজালেম কী অবস্থায় থাকবে। এমনকি নতুন ধরনের দু-দেশ মিলে জেরুজালেমের কর্তৃত্ব রাখবে কি না—এগুলো পরের বিষয়। প্রথম হলো দুই রাষ্ট্র তৈরি করা। এখন দুই রাষ্ট্র তৈরির মধ্যেই তো ঝামেলা আছে। ঝামেলাটা তৈরি করেছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনের যে অংশ ১৯৪৯-এর আগের কথা যদি বলি ওই সময় যে দুই রাষ্ট্র হয়েছে ওই ফিলিস্তিনের অংশ তারা খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং নতুন বসতি করেছে। যেমন জোর করে জমি দখল করা তাও আবার ধর্মের নামে, যেটা আরও সাংঘাতিক। যে ইউরোপ-আমেরিকা বিশ্বে সেকুলারিজমের প্রচার করে এবং সব জায়গায় ধর্মকে ব্যক্তিগত রাখতে বলে সেই ইউরোপ-আমেরিকাই বড় আকারে ধর্মের নামে এসব করছে। এবং যতটা না ইহুদিরা জড়িত তারচেয়ে বেশি খ্রিষ্টান জায়ালিজরা জড়িত। এটা আরও মজার ব্যাপার। যে কারণে ইহুদিরা এবার জেগে উঠেছে। এমনকি ইসরায়েলের মধ্যেও প্রচুর ইহুদি আছেন যারা ফিলিস্তিনিদের নিধনের বিপক্ষে। যেটা আগে এতো প্রচার করা হতো না। এখন আমাদের দেখা দরকার এই চাপটা কীভাবে তারা আনতে পারে। আমি মনে করি এই জেরুজালেম খণ্ড-বিখণ্ড যেটা হয়ে গেছে সেগুলো পরিবর্তন এই জনগণ ছাড়া আর সম্ভব নয়। জনগণ যদি পরিবর্তন করে এই বসতিগুলো থেকে সরে দাঁড়ায় তাহলে দুটো রাষ্ট্র হবে। কারণ যে অবস্থায় এখন আছে সেই অবস্থায় কিন্তু দুই রাষ্ট্র করা সম্ভব নয়। যে কারণে ইয়াসির আরাফাত একটা সময় অনেক কিছু মেনে নেননি যেটা ইসরায়েল করতে চেয়েছিল।

চ্যানেল আই: দুই পক্ষের লড়াইয়ে বারবার ধর্মকে সামনে আনা হচ্ছে, আপনার ব্যাখ্যা কী?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: আসলে লড়াইটা মূলত যারা উপনিবেশবাদী আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত। এটাই হলো মূল। এখানে ধর্মের বিষয়টা কিন্তু পরে। ইসরায়েল বা জায়ালিজরা ধর্মের ব্যাখ্যা সামনে নিয়ে এসেছে। অবাক কাণ্ড, ইউরোপ আর আমেরিকাই সেই ধর্মের ব্যাখ্যাটাকে মেনে নিচ্ছে। এখন স্বাভাবিকভাবে ফিলিস্তিনে কিন্তু সব ধর্মের মানুষ আছে। এখানে ইহুদিরাও কিন্তু আছে। বড় আকারে ইসরায়েলি লেখক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইলান পাপ্পের মতো লেখকরা তাদের লেখার মধ্যে সবসময় কিন্তু ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলেছেন। ইসরায়েল যে সমস্যাটা মনে করে তা হলো ফিলিস্তিন স্বাধীন রাষ্ট্র হলে তাদের অস্তিত্ব থাকবে না। কারণ ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করা হয়েছে বিভিন্ন দেশে। দেশটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলে বিতাড়িত জনগণ নিজ দেশে ফেরত আসবে। এটা হলে ইহুদিরা সেখানে সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। সেই জায়গায় হলো সমস্যা। এখন সমাধান আমি মনে করি, গণতান্ত্রিক কাঠামো ছাড়া তো সম্ভব নয়। সেখানে এমন একটা ম্যানেজমেন্ট করতে হবে যে সব ধর্মের যারা আছে, সবারই সমঅধিকার থাকবে। অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু এগুলো অনেক পরের কথা। বর্তমানে যেটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েল গণহত্যা বন্ধ করতেই রাজি হচ্ছে না। যেখানে আমেরিকার সরকার জড়িত, জার্মানি, ইউকে সরাসরি জড়িত।
চ্যানেল আই: সম্প্রতি পশ্চিমা বিশ্বে ছাত্রদের বিক্ষোভকে ‘অনেক ক্ষেত্রে একটি ইহুদিবিদ্বেষী ভাষ্য’ বলে নিন্দা করেছেন লেখক সালমান রুশদি। রুশদী আরও বলেছেন, ফিলিস্তিন যদি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা হামাসদের দিয়ে পরিচালিত হবে এবং সেটি একটি তালেবান নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রের মতো রাষ্ট্র হবে। তা হবে ইরানের একটি স্যাটেলাইট রাষ্ট্র।
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: রুশদির বক্তব্যকে সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নাই। আমার মনে হয় না ওই অবস্থায় সালমান রুশদি এখন আছে। তার প্রথম বইটা নাম করেছিল বলেই সে পরের দিকে অনেক ব্যাপারে বেশি বাড়াবাড়ি করেছে। তাকে কেউ গুরুত্ব দেয় বলে আমার মনে হয় না। সে পশ্চিমা কাঠামোর মধ্যেই আছে। তার কথাবার্তাতেই বুঝা যাচ্ছে, তিনি একেবারে পশ্চিমাপ্রেমিক। এবং তিনি জানেন যে এগুলো বললে যে সার্কেলে তিনি ঘুরেন সেই সার্কেলে তার অবস্থানটা ভালো হবে। কারণ তিনি হয়ত জানেন না যে- গণহত্যা কী? এর পরিণাম কী দাঁড়ায়। যার জন্য আমি মনে করি না সালমান রুশদিকে সিরিয়াসলি নেওয়ার কোনো কারণ আছে বরং তার সম্পর্কে বললে সে আবার নিউজে চলে আসে। এসব কথাবার্তার খুব গুরুত্ব আছে বলে মনে হয় না।
চ্যানেল আই: চলমান সংঘাতের শুরুটা তো হামাস করেছে, এমন কথাও শোনা যাচ্ছে।
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: যখন এই ধরনের লড়াই হয়, যেখানে ৫০-৭০ বছর ধরে একটা গোষ্ঠী অত্যাচারিত হতে থাকে। যারা জাতিগত নিধনের শিকার হচ্ছে, গণহত্যার কবলে পড়ছে তারা রি-অ্যাক্ট করবেই। রি-অ্যাকশনের মধ্যে আমি যদি বলি হামাসের লড়াই মূলত ন্যায় বিচারের লড়াই। এখন সেখানে যদি টেরোরিজম হয়, টেরোরিজম বলতে বুজাচ্ছি -‘আনলফুল’ কিলিং। ‘আনলফুল’ কিলিং যদি হয়, আমি যদি সংখ্যার দিক থেকে দেখি তাহলে ইসরায়েল-আমিরেকাই তো বড় টেরোরিস্ট হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধে ৩৬ হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছে। ইসরায়েলে মারা গেছে ১৪শ জনের মতো।
তা ছাড়া, বর্তমান ইসরায়েলের যে অঞ্চল সেটা কিন্তু মূল ইসরায়েল নয়। তারা তাদের বসতি বাড়িয়ে এ অবস্থায় এনেছে। সুতরাং হামাস যেখানে আক্রমণ করেছে সেটা কিন্তু ফিলিস্তিনের অংশ। তো আজকে বাংলাদেশের অংশ যদি কেউ দখল করে তাহলে বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবে সেখানে আক্রমণ করবে এবং আক্রমণ করলে সেখানে অনেক ধরনের মানুষ মারা যাবে। কিন্তু একেবারে দেখে শুনে ‘আনলফুল’ কিলিং যেটা ইসরায়েল করে যাচ্ছে যার একাধিক প্রমাণ আছে যে, তারা (ফিলিস্তিনিরা) সাদা পতাকা দেখিয়েছে তারপরও তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। শিশুরা দাঁড়িয়ে আছে তাদেরকেও মেরে ফেলা হয়েছে। খাবার আনতে গেছে তাদের ওপর বোমা হামলা হয়েছে। হাসপাতালে বোমা ফেলেছে। এগুলো যদি কেউ করে থাকে, তাহলে প্রত্যেকটা দেশের আইনি বিচারের কাঠামো থাকে। সেই অনুযায়ী বিচার হবে।







