১৯৫১ সালে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা কথাসাহিত্যিক সাদাত হাসান মান্টো পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে একটি ছোট গল্প প্রকাশ করেছিলেন। গল্পটির নাম ছিলো ইয়াজিদ। এই গল্পের উপজীব্য বিষয় আবর্তিত হয়েছিলো পাকিস্তানের ফসল উৎপাদন করা নদীগুলোর পানি বন্ধ করার ভারতীয় পরিকল্পনার গুজবকে কেন্দ্র করে। বিশ্ব আজ সেই গল্প বাস্তবের মুখোমুখি। দুটি পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে জলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চরমে।
গল্পের এক চরিত্র বলেছিল, “কে নদী বন্ধ করতে পারে? এটা তো ড্রেন নয়, নদী।”
২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়, যাদের প্রায় সকলেই পর্যটক ছিলেন। এই সহিংসতার জন্য ভারত পাকিস্তান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে দায়ী করে আসছে। হত্যাকাণ্ডের পর ভারত ঘোষণা করে যে, ভারত ৬৫ বছরের পুরোনো সিন্ধু জল চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
এই আন্তসীমান্ত জল চুক্তি সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি নদীর পানি বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করে এবং এটি ২৭ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য জীবনরেখা হিসেবে কাজ করে, যাদের বেশিরভাগ মানুষ পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাস করে।
১৯৪৮ সালে ভারত যখন প্রথম পানিপ্রবাহ বন্ধ করেছিল, তখন পাকিস্তানের পাঞ্জাবের প্রায় আট শতাংশ কৃষি জমি পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এবং সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে সাদাত হোসেন মান্টো ইয়াজিদ নামের ছোট গল্পটি লিখেন এবং সেই সঙ্কট থেকেই শুরু হয় আলোচনার। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ইন্দাস (সিন্ধু) পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
ভারতের ঘোষণার একদিন পর, পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি ভারতের এই একতরফা পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে। এবং ভারতকে সতর্ক করে বলে, পাকিস্তানের পানির যেকোন বিচ্যুতিকে যুদ্ধের ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হবে।
কিছুদিনের মধ্যেই মে মাসে ভারত ও পাকিস্তান তীব্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ৪ দিন ব্যাপী এই সংঘর্ষে উভয় দেশ একে অন্যের উপর ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে তাদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। তবে, যুদ্ধবিরতি হলেও ভারত প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা স্থায়ীভাবে এই চুক্তিটি স্থগিত রাখবে।
১৯৪৮ সালে ভারত যখন প্রথম জলপ্রবাহ বন্ধ করেছিল, তখন পাকিস্তানের পাঞ্জাবের প্রায় আট শতাংশ কৃষি জমি পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এবং সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে সাদাত হোসেন মান্টো ইয়াজিদ নামের ছোট গল্পটি লিখেন এবং সেই সঙ্কট থেকেই শুরু হয় আলোচনার। অবশেষে, ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার সাথে এক সাক্ষাৎকারে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চুক্তির প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে এই চুক্তি দুই দেশের শান্তি ও অগ্রগতির জন্য। কিন্তু একবার তা লঙ্ঘন করা হলে, রক্ষা করার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
ভারত এবং পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা তাদের মতামত তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, নদীর প্রবাহ বন্ধ হলে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকাকে হুমকির মুখে পরবে। তারা সতর্ক করে বলেন, এটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।
এখন বড় প্রশ্ন কি ভারত সত্যিই পাকিস্তানের জল বন্ধ করতে পারবে কিনা?
বর্তমান পরিকাঠামো অনুযায়ী, ভারত পুরোপুরি জল বন্ধ করতে পারবে না। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, সামান্য পরিবর্তন বা বাধাও পাকিস্তানের ক্ষতি করতে পারে, বিশেষ করে শীতকালে। ভারত যদি সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলির প্রবাহ বন্ধ করতে সক্ষম হয় তবে পাকিস্তানকে যে সংকটের মুখোমুখি হতে হবে তা মোকাবেলা করার জন্যপাকিস্তানের কাছে পর্যাপ্ত জলাধারা নেই।
১৯৬০ সালের চুক্তি অনুযায়ী পূর্ব তীরের ৩ টি নদী (রবি, সুতলজ, বিয়াস) সম্পূর্ণভাবে ভারতের জন্য এবং পশ্চিম দিকের তিনটি নদী (ইন্দাস, ঝেলম, চেনাব) পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করা হয়। ভারতকে পশ্চিম তীরের নদীগুলিতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অনুমতি দেওয়া হলেও জলপ্রবাহ যাতে ব্যাহত না হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়।
সিন্ধু জল চুক্তির ৬৫ বছরের ইতিহাসে এটি বহু চাপ ও সংকট সহ্য করেছে যুদ্ধ, ভারত-শাসিত কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, নিয়মিত সামরিক সংঘর্ষ, ভারতে প্রাণঘাতী হামলা এমনকি ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক পরীক্ষা সব কিছুর মধ্যেও চুক্তি টিকে ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের পাহেলগাম শহরে পর্যটকদের ওপর হামলা সেই সহিষ্ণুতার সীমা অতিক্রম করে দেয়। যদিও এই চুক্তির ভঙ্গুরতা অনেক আগেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, কাশ্মীরের উরি শহরে একটি ভারতীয় সেনা ঘাঁটিতে হামলায় অন্তত ১৮ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। তখনকার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন “রক্ত ও পানি একসঙ্গে প্রবাহিত হতে পারে না।” ঠিক নয় বছর পর, ভারত সত্যিই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে। তবে পাকিস্তানও কম যায়না।
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেন, “সিন্ধু আমাদের, এবং চিরকাল আমাদেরই থাকবে। হয় আমাদের পানি বয়ে যাবে, নয়তো তাদের রক্ত।
পাকিস্তান কেন চিন্তিত?
ভারত ঝেলম ও চেনাব নদীতে বেশ কিছু বিদ্যুৎ প্রকল্প করেছে এবং আরও কিছু নির্মাণাধীন রয়েছে, যেমন: কিশনগঙ্গা, বাগলিহার, ও রাটেল ড্যাম। পাকিস্তান মনে করে এই প্রকল্পগুলি জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ভারতের হাত শক্ত করবে এবং এই প্রকল্পগুলি ভারতের হাতে জলপ্রবাহ কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিশনগঙ্গা বাঁধ ঝেলমের প্রবাহ পরিবর্তন করতে পারে। তবে ভারত এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের হাতে এখনো এমন অবকাঠামো নেই যাতে তারা চেনাব বা ঝেলমের জল পুরোপুরি আটকে দিতে পারে। তবে শীতকালে যখন জলপ্রবাহ কম থাকে, তখন জলধারা রোধ করলে পাকিস্তানের শস্য উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে চেনাব নদীর উপর নির্মিত র্যাটেল জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সর্বশেষ বিরোধের বিষয়।
পাকিস্তানের প্রস্তুতি কেমন?
পাকিস্তানের পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা সীমিত। পাকিস্তানের তিনটি প্রধান জলাধার রয়েছে: মঙ্গলা, তারবেলা ও চাশমা। এ ছাড়াও রয়েছে ১৯টি ব্যারাজ এবং ১২টি আন্তঃনদী সংযোগ খাল।
এদের সম্মিলিত জলসংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় ১৫ মিলিয়ন একর ফুট। যা প্রায় চার সপ্তাহের জন্য যথেষ্ট। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অন্তত ১২০ দিনের জন্য সংরক্ষণের ক্ষমতা থাকা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান যতই জলাধার তৈরি করুক না কেন, দীর্ঘমেয়াদি পানি অবরোধের মুখে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
খুররম দস্তগীর খান, পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভারতকে সতর্ক করে বলেন, “ভারত যদি পানি সরিয়ে নেওয়ার বা সংরক্ষণের সক্ষমতা অর্জন করে, তবে তা একটি যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
প্রতীক না বাস্তবতা?
কয়েকজন জল বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, ভারতের সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তটি পাকিস্তানের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিকর নয়, তবে ভারতের পক্ষ থেকে একটি পাকিস্তানের প্রতীকী পদক্ষেপ। পাকিস্তানের পরিবেশ ও জল বিশেষজ্ঞ নাসির মেমন আল জাজিরাকে এক সাক্ষাতে এটিকে রাজনৈতিক কৌশল বলে আখ্যায়িত করেন, যা ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানে উদ্বেগ সৃষ্টি করার জন্য করা হয়েছে, জলপ্রবাহ পরিবর্তনের জন্য নয়।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ভারতীয়-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গাও বলেন, সিন্ধু জলচুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করার কোনও বিধান নেই। চুক্তিটি যেভাবে তৈরি হয়েছে, সেখানে স্থগিত করার কোনও সুযোগ নেই। এটি হয় বাতিল হতে পারে, না হয় অন্য চুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে এবং সেটির জন্য উভয় দেশের সম্মতি প্রয়োজন।
সমাধানে যুদ্ধ না কূটনীতি?
ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তকে পাকিস্তান ‘যুদ্ধের ঘোষণা’ হিসেবে দেখছে, যদিও কূটনৈতিক এবং আইনি পথেও তারা আগাচ্ছে। পিসিএ ইতিমধ্যে জানিয়েছে, চুক্তি স্থগিত করলেও ভারত আদালতের এখতিয়ার মানতে বাধ্য। তবে ভারত পিসিএর ক্ষমতা মানতে অস্বীকার করছে। ফলে, শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য দুইটি পথ খোলা: যুদ্ধ অথবা আলোচনা।
পাকিস্তানের এক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন: “ইন্দাস অববাহিকার জল পাকিস্তানের ২৫ কোটির বেশি মানুষের প্রাণ। যদি ভারতের কোনো পদক্ষেপ আমাদের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, আমরা সময় ও স্থানের বিবেচনায় উপযুক্ত এবং বৈধ জবাব দেব।”








