ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানের মধ্যে আহত অনেক বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় হাসপাতালে না গিয়ে গোপনে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে আসছেন কিছু চিকিৎসক, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মী।
বুধবার ২৯ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, ইস্পাহান শহরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণী তারা (ছদ্মনাম) জানান, নিরাপত্তা বাহিনী মোটরসাইকেলে এসে হঠাৎ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তার বন্ধু একজন সশস্ত্র সদস্যকে অনুরোধ করেছিলেন যেন গুলি না করা হয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালানো হয়। তারা দুজনই গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। কাপড়চোপড় রক্তে ভিজে যায়।
স্থানীয় এক ব্যক্তি তাদের গাড়িতে তুলে নিলেও তারা হাসপাতালে যেতে রাজি হননি। তারা বলেন, হাসপাতালে নিলে গ্রেপ্তার হওয়ার ভয় ছিল। পরে আশপাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন তারা। প্রায় ভোর পর্যন্ত সেখানে লুকিয়ে থাকার পর পরিচিত এক চিকিৎসকের মাধ্যমে গোপনে চিকিৎসা নেন। পরে এক সার্জন বাড়িতেই অস্ত্রোপচার করে শরীর থেকে কিছু বার্ডশট বের করেন, তবে সব বের করা সম্ভব হয়নি বলে সতর্ক করেন।

তেহরানের সার্জন নিমা ((ছদ্মনাম)) জানান, ৮ জানুয়ারি বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের সময় তিনি রাস্তায় অসংখ্য আহত তরুণকে দেখেছেন। এক আহত যুবককে গাড়ির ডিকিতে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল, যাতে পুলিশ সন্দেহ না করে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর টানা প্রায় চার দিন ঘুম না নিয়ে অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
নিমা বলেন, অনেক আহতের গুলি লেগেছে মুখ, পা ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে। কারও কারও অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়েছে, অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে গেছেন। অন্যদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, সহিংসতায় ৩ হাজার ১০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা ‘দাঙ্গাকারীদের’ হাতে নিহত সাধারণ মানুষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসময় প্রায় ১৩ হাজার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
তবে স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে এবং রোগীদের মেডিকেল রেকর্ড নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। এজন্য অনেক চিকিৎসক গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি নথিতে উল্লেখ করতেও ভয় পাচ্ছেন। ছোট শহরগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে আহতদের তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এমনকি আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগে চিকিৎসকদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

নরওয়েভিত্তিক সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, অন্তত পাঁচজন চিকিৎসক ও এক স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্প্রতি কাজভিন শহরের এক সার্জন আলিরেজা গোলচিনিকে আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে ‘মোহরেবেহ’ বা ‘স্রষ্টার বিরুদ্ধে শত্রুতা’র অভিযোগ আনা হয়েছে, যা ইরানে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ভয় ও দমননীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করে আহত বিক্ষোভকারীদের সহায়তা বন্ধ করার চেষ্টা চলছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
চলতি মাসে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে কত মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন, তার সঠিক সংখ্যা জানা যাচ্ছে না। ইন্টারনেট বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ থাকায় তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৩০১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এইচআরএএনএ আরও জানিয়েছে, এর মধ্যে ৫ হাজার ৯২৫ জন বিক্ষোভকারী, ১১২ শিশু, ৫০ জন পথচারী এবং ২১৪ জন সরকারপন্থি ব্যক্তি রয়েছেন। আরও ১৭ হাজারের বেশি মৃত্যুর তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। অন্তত ১১ হাজার বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের অনেকেই গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতে বা গোপন স্থানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।







