ধানমন্ডিতে অনুষ্ঠিত হলো ‘বিডিডিএল পিস পার্ক’-এর দারোদ্ঘাটন উপলক্ষে আয়োজিত মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান ‘স্বপ্নপূরণ উৎসব’। পরিবেশবান্ধব উপকরণে নির্মিত, সবুজে মোড়ানো এই আধুনিক আবাসিক ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের মাধ্যমে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) বিকেল ৪টায় কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর বিডিডিএলের প্রকৌশল বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. হারুনার রশিদ স্বাগত বক্তব্যে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
উৎসবে উপস্থিত ছিলেন ফ্ল্যাট মালিক, বিশিষ্টজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। বক্তব্য রাখেন ইউএনডিপির কর্মকর্তা কামালউদ্দিন, ফ্ল্যাট মালিক সমীর কুমার কুন্ডু, তিলোত্তমা বাংলা গ্রুপের জোয়ারদার নওশের আলী, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইউসুফ, পিকেএসএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের এবং জমির মালিক প্রফেসর মো. আফজাল হোসেন বাচ্চু।
বিডিডিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ বাতেন খান ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, “এই প্রকল্প শুধু একটি বাড়ি নয়—এটি একটি স্বপ্নপূরণের প্রতীক। এখানে সবাই একসাথে একটি বৃহৎ যৌথপরিবারের মতো বসবাস করবেন—এই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করেছি।”
তিনি আরও জানান, জাতীয় টি–টোয়েন্টি ক্রিকেট দলের অধিনায়ক লিটন দাসসহ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইউসুফ এবং ড. সমীর কুমার কুন্ডু এই ভবনের গর্বিত মালিক।
অনুষ্ঠানে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে ভবন নির্মাণের প্রতিটি ধাপ তুলে ধরা হয়। ফ্ল্যাট মালিকদের নিয়ে গঠিত হয় ‘বিডিডিএল পিস পার্ক ফ্ল্যাট মালিক অ্যাসোসিয়েশন’।
পরে অতিথিরা ছাদে ঘুরে দেখেন, যেখানে তাদের জন্য ছিল বিশেষ আপ্যায়নের আয়োজন। তারা এই বাড়ির নান্দনিক নকশা ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনায় মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।
বিডিডিএল পিস পার্কের বিশেষত্ব
শহরের কোলাহল, ধুলো আর কংক্রিটের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরো সবুজ স্বপ্ন—বিডিডিএল পিস পার্ক।
ঠিক যেন শহরের বুকেই গড়ে ওঠা এক নির্মল আশ্রয়, যেখানে থাকা মানে কেবল ছাদের নিচে থাকা নয়—থাকা মানে বাঁচা, নির্মলভাবে, নির্ভারভাবে।
ধানমন্ডির ৬-এ রোডের ৬৯-ই নম্বর বাড়ির এই বিশেষ আবাসন প্রকল্পটির নাম যেমন আলাদা, তেমনই আলাদা এর আত্মা। এই ভবনের প্রতিটি কোণা যেন বলে, “এখানে মানুষ শুধু বসবাস করে না, তারা জীবনযাপন করে।”
কাচারিঘর: যেখানে অতীতের সঙ্গে দেখা হয়
প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ লবির বাঁ পাশে একটি বসার জায়গা, নাম ‘কাচারিঘর’। শব্দটি যেন স্মরণ করিয়ে দেয় পুরোনো দিনের সেই আতিথেয়তা, আত্মীয়তা আর গল্পের সন্ধ্যা।
দেয়ালগুলো মাটির, বসার বেঞ্চ তৈরি পুনর্ব্যবহৃত কাঠ দিয়ে, আর ভেতরে ছড়ানো-ছিটানো গাছের ছোঁয়া। এটি নৈসর্গিক নান্দনিকতায় ভরা শুধু নয় বরং এক অনন্য সাংস্কৃতিক বার্তা বহন করে—শেকড়ের টান।
এই ঘরের নকশা করেছেন মাটি বিশেষজ্ঞ আবদুন নাইম। তার চিন্তাভাবনায় মিশে আছে পরিবেশ, ঐতিহ্য আর ব্যবহার উপযোগিতা—তিনের অনুপম সমন্বয়।
পাঠাগার ‘বই সারা বেলা’: বইয়ের সঙ্গে দুপুরের গল্প
লবির পাশেই সিঁড়ির ধারে তৈরি হয়েছে ছোট কিন্তু প্রাণবন্ত একটি পাঠাগার—বই সারা বেলা। শিশুরাও যেন বইকে ভালোবাসে, সেজন্য পাঠাগারটিকে সাজানো হয়েছে রঙে-তুলিতে।
এখানে শুধু বই পড়া নয়, তৈরি হয়েছে এমন এক পরিমণ্ডল যেখানে জ্ঞান, কল্পনা আর সৃজনশীলতা মিলেমিশে তৈরি করে এক নতুন অভিজ্ঞতা। আবাসনের মাঝে এমন লাইব্রেরি একটি অভূতপূর্ব উদ্যোগ।
ত্রিমাত্রিক ঘর: শরীর, আত্মা ও সম্পর্কের মেলবন্ধন
দশম তলার দেয়ালে নজরকাড়া একটি চিত্রকর্ম। তার পাশেই একটি দরজা, ওপরে লেখা—ত্রিমাত্রিক ঘর। এটি শুধু একটি ঘর নয়, বরং জীবনের তিনটি দিককে একসঙ্গে ধারণ করে।
এখানে আছে ব্যায়ামের জায়গা, নামাজের স্থান, এমনকি ছোটখাটো পারিবারিক অনুষ্ঠানের আয়োজনের সুবিধাও। এই জায়গা যেন প্রতিদিনের ক্লান্তি ঘোচানোর এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।
ছাদের আলসে ঘর: লর্ডস থেকে ছাদের কোণে
ছাদের পূর্ব পাশে যে কাঠামোটি, তার নাম আলসে ঘর। লন্ডনের লর্ডস স্টেডিয়াম থেকে অনুপ্রাণিত নকশায় তৈরি এই ঘর যেন নগরজীবনের চাপে হাঁপিয়ে ওঠা মনকে নিমেষেই প্রশান্ত করে।
এখানে বসে চাঁদের আলো দেখা যায়, বৃষ্টির দিনে শব্দ শোনা যায়। একটা বিশেষ চিত্রকর্মের পাশেই রয়েছে থ্রিডি ফটো বুথ, যেখানে ছবি তুললে মনে হয়, আপনি ফ্রেমে বাঁধা একটি শিল্পকর্মেরই অংশ।
প্রকৃতি ও স্থাপত্যের যুগলবন্দি
বিডিডিএল পিস পার্কের প্রতিটি তলায় রয়েছে সবুজে মোড়ানো বারান্দা। আলোর জন্য দিনের বেলায় লাইট জ্বালানোর দরকার পড়ে না। এমনকি অনেক সময় ফ্যানও অন করার প্রয়োজন হয় না।
পুরো বিল্ডিংজুড়ে রিসাইকেল উপকরণের ব্যবহার, ব্লক ইটের ব্যবহার এবং রিইউজড কাঠের ছোঁয়া ভবনটিকে করেছে পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং উদাহরণযোগ্য।
ছাদজুড়ে রয়েছে টবে ভরা ভেষজ গাছ, রঙের পুরনো বালতিকে পাটের রশি দিয়ে মুড়িয়ে তৈরি টবের নান্দনিকতা, ব্ল্যাক জিনজার থেকে আমেরিকান লেমনগ্রাস, এমনকি রয়েছে দশ রকমের ভেষজ চা। এটি শুধু একখণ্ড ছাদ নয়, বরং একটি শহুরে হার্ব গার্ডেন।
একটি আন্দোলনের নাম: পিস পার্ক
এই প্রকল্প কেবল একটি আবাসন নয়—এটি একটি সচেতনতা। একটি আন্দোলন—শহরের ভেতরে টেকসই ও মানবিক জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা। জলবায়ু পরিবর্তনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এক শক্তিশালী বার্তা।
এটি প্রমাণ করতে চাইলে শহরের মধ্যেই গড়ে তোলা যায় এমন এক আবাসন, যেখানে মানুষ কেবল টিকে থাকে না, বরং প্রাণভরে বাঁচে।
বিডিডিএল পিস পার্ক তাই শুধু ‘স্বপ্নপূরণ’ নয়—এ এক নতুন বসবাসের দর্শন, ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া এক বাসযোগ্য পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি।







