উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি শহরের অলিগলিতে আজও তিনি শুধুই ‘বিউটি’। রাজনীতির পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এই নামেই তাঁকে স্মরণ করেন এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা।
বুধবার ৩১ ডিসেম্বর এক প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘বিউটি’ নামেই তাঁকে স্মরণ করেন জলপাইগুড়ি শহরের প্রবীণ বাসিন্দারা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বলা হয়, দেশভাগের আগে অবিভক্ত বাংলার জলপাইগুড়ির নয়া বস্তি এলাকায় সপরিবারে বাস করতেন খালেদা জিয়ার বাবা এস্কান্দার মজুমদার। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণায় উঠে আসছে সেই কিশোরীর অবয়ব, যাঁর গায়ের রং ছিল দুধে-আলতা, দু’চোখে অপার বিস্ময়। অত্যন্ত সুন্দরী ছিলেন বলে পাড়া-প্রতিবেশী এবং পরিবারের লোকজন তাঁকে আদর করে ডাকতেন ‘বিউটি’। খালেদা খানম ‘পুতুল’ নাম ছাপিয়ে জলপাইগুড়ির বাতাসে আজও তাঁর ‘বিউটি’ ডাকনামই নয়া বস্তির মানুষের কাছে বেশি পরিচিত।
স্মৃতিবিজড়িত সেই পাঠশালা:
নয়া বস্তির ধুলোমাখা রাস্তায় তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছিল সুনীতি বালা সদর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুলের পুরনো নথি বা স্মৃতি আজ ফিকে হলেও, বিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের মন খারাপ। শান্ত স্বভাবের মেধাবী ছাত্রী হিসেবে বিউটির দৌড়ঝাঁপ আজও এক জীবন্ত ইতিহাস। স্কুলের পক্ষ থেকে তাঁর জন্য এক শোকসভা আয়োজনেরও পরিকল্পনা চলছে। পাড়ার এক প্রতিবেশী বলেন, যে মেয়েটি আমাদের সঙ্গে এই গলিতে খেলে বেড়াত, পরবর্তীকালে তিনিই একটি রাষ্ট্রের ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠেছিলেন, ভাবলে আজও শিহরণ জাগে।
দেশভাগ ও চিরবিচ্ছেদ:
১৯৪৭-এর দেশভাগ আর সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার আঁচ লেগেছিল মজুমদার পরিবারেও। ইতিহাসবিদ ড. আনন্দ গোপাল ঘোষের মতে, বিউটির বাবা এস্কান্দার মিয়া চায়ের ব্যবসার সূত্রে জলপাইগুড়ি এসেছিলেন। কাজ করতেন ‘দাশ অ্যান্ড কোম্পানি’তে। দেশভাগের পর মুখার্জি পরিবারের সঙ্গে জমি বিনিময় করে ১৯৫০ সাল নাগাদ তাঁরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান।
বর্তমানে তাঁদের সেই বাগান বাড়ির এক অংশে বাস করেন চক্রবর্তী ও গোপ পরিবার। ওই বাড়ির বাসিন্দা ঝর্না গোপ বা নীলকন্ঠ গোপদের কণ্ঠেও আজ শোকের সুর। প্রতিবেশী তথা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সম্পাদক ভোলা মণ্ডল কিংবা ফুটবলার পুটু রহমানদের স্মৃতিতেও উজ্জ্বল খালেদাদের সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক বন্ধন।
আবেগের নাম ‘বিউটি’:
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নয়া বস্তির ভোল বদলেছে, মাটির বাড়ির জায়গায় উঠেছে অট্টালিকা। কিন্তু রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জলপাইগুড়ির মানুষের কাছে এই মৃত্যু যেন এক নস্টালজিয়া। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেন। কিন্তু এপারে তিনি আজও সেই ‘বিউটি’- যে সাতচল্লিশের কাঁটাতারে ভিটেমাটি হারানো লাখ লাখ মানুষের মতো নিজের শিকড় রেখে গিয়েছিলেন এই জলপাইগুড়িতেই।








