মাত্র ৫৩ বছরে নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীন দেশের গৌরবের মাহাত্ম্য হারালো? পরম ঘৃণিত রাজাকার-আলবদর যারা ইতিহাসের নিকৃষ্ট আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত, সেই তাদের পক্ষে স্লোগান দিল এদেশের তথাকথিত একদল তরুণ। যারা নিজেদের মেধাবী গণ্য করে মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে স্বাধীন দেশের পরাধীন শক্তির পক্ষে লড়ছে? তাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে রাজাকার হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।
এই ভয়াবহ সত্য স্বাধীনতার মাত্র ৫৩ বছর বয়স, যখন স্বাধীন দেশ অর্জনের পথে লাখো শহীদের পক্ষে তাদের স্বজন প্রিয়জনেরা জীবিত। ধুঁকে ধুঁকে হলেও বেঁচে আছে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে জড়িয়ে আছে সেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলনের ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম। ১৯৭১ এর ২ মার্চ ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম পতাকা উত্তোলন ও নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস প্রতিবছর স্মরণ করা হয়। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এদেশের স্বাধীনতার পথে স্বাধীকারের চেতনায় অমর একুশ ফেব্রুয়ারি পথ পরিক্রমায় এদেশের রাজনৈতিক ও মননের বুনন গেঁথে দিয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরেই সূচিত হয়েছে নব্বই-এর স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজাকার ধ্বনিতে কেঁপে রাতের অন্ধকার আর কেঁদেছে এদেশের লাখো শহীদের আত্মা এবং জীবিত যুদ্ধাহতরা হৃদযন্ত্রের কম্পন সাথে চোখের পানিতে সয়লাব করেছেন।
মাত্র ৫৩ বছর আগে পরাধীনতার কঠোর শৃঙ্খল কীভাবে বাঙালির নিত্য দিনের জীবনে লেখাপড়ার সীমিত ব্যবস্থা, চাকরিতে বৈষম্য, মেধাবী হওয়ার পরেও সিভিল সার্ভিসে কিংবা সেনাবাহিনীর চাকরিতে প্রবেশযোগ্যতা ছিল না-একথা ভুলে গেল? এরা কোন প্রজন্ম যারা ইতিহাসের বিপরীত পথে হেঁটে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরব গাঁথাতে অভক্তি ও অরুচিতে ভুগছে? কারণ কী, কারা তাদের এই ইতিহাসবিমুখ করে পেছনে নিয়ে যাচ্ছে? এদের প্রত্যেকের ঠিকুজি চেক করে চিহ্নিত করা দরকার! স্বাধীন দেশের মাত্র ৫৩ বছরের ইতিহাস উল্টোপথে ধাবিতকারীদের এদেশে ঠাঁই হতে পারে কী।
স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধারা যেন গরীবের বউ
স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধারা যেন গরিবের বউ হয়ে উঠেছে। কৌতুকের ছলে গরিবের সুন্দরী বউকে যেভাবে ভাবী ডেকে খানিক মজা লওয়া যায় সেই পরিস্থিতি যেন দেশের কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা শুরু করেছে। গরিবের বউকে ভাবীর ডাকার সুবাদে সুযোগ বুঝে ভাবীর শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত বুলিয়ে বিকৃত সুখ পাওয়া যায় তেমনই এক বিকৃত চিন্তায় মেতেছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি। কারণ সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে গত ৫ জুন হাইর্কোটের দেওয়া রায়ের মূল অংশ প্রকাশ করেছে।
বহুল আলোচিত ওই রায়ের মূল অংশে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে কোটা কম বা বেশি করা যাবে। কোনো পাবলিক পরীক্ষায় যদি কোটা থেকে আবেদনকারী চাকরিপ্রার্থী না পাওয়া যায় তবে সাধারণ মেধা তালিকায় থাকা প্রার্থীর মাধ্যমে তা পূরণ করার স্বাধীনতা থাকবে। এই যে পরিবর্তন পরিবর্ধনের সুযোগ উচ্চআদালত দিল এই বিষয়ে আন্দোলনকারীদের কথা বলার বা কাঙ্খিত পথে এগিয়ে যাবার একটি অনব্যদ সুযোগ তৈরী হল। তারপরও কেন মাঠ সরগরম করছে শিক্ষার্থী? যেখানে স্বয়ং প্রধান বিচারপতি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, রাস্তায় শ্লোগান দিয়ে আদালতের রায় পরিবর্তন করা যায় না। আন্দোলনকারীদের তিনি নিজেদের সন্তান গণ্য করে শিক্ষার্থীরা ভুল বুঝে এটা করছে বলেও স্নেহময় মন্তব্য করেছেন। সর্বোপরি প্রধান বিচারপতি আন্দোলনকারীদের প্রতি সংবেদনশীলতা প্রকাশ করে প্রতিবাদকারীদের আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের বক্তব্য তুলে ধরারও সুযোগ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা যদি যৌক্তিকভাবে দেশের বিপুল সংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর কল্যাণের কথা চিন্তা করে মাঠে নামে তবে তো এই সুযোগ লুফে নেওয়ার কথা! তা না করে পথ আটকে, ব্যারিকেড দিয়ে, বিক্ষোভ মিছিল সহযোগে পথের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপির নামে ২৪ ঘন্টার সময় সীমা বেধে দেওয়ার উদ্দেশ্য কি?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধীতা করায় আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য?
যুক্তির খাতিরে এই প্রসঙ্গে বলতে হচ্ছে, ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর নবম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। সেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করা হয়। এর মানে দাঁড়ায়, রাষ্ট্র স্বয়ং মনে করে মুক্তিযোদ্ধারা রাষ্ট্রের সবচেয়ে অবহেলিত অচ্ছুত একেবারেই সাধারণ আমজনতা। তাই যাদের ত্যাগে এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব অর্জিত হলো তাদের মতোই বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরাও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির নাগরিক। এ কারণে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য শুধু মাত্র পিওন চাপরাশির মতো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে কোটা বহাল ছিল? যে বীর মুক্তিযোদ্ধা পিতারা অসীম ত্যাগে দুঃসাহসীকতায় এদেশকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করলো সেই বীরদের সন্তানেরা এদেশে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির যোগ্যতা রাখে না?
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্ম কমিশন-‘পিএসসি’র প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আবেদ আলীদের পিএসসির রমরমা ব্যবসার খবর যখন জাতীয় ইস্যু তখনোও আন্দোলনকারী কেন নিশ্চুপ? পিএসসির পরিচালক থেকে ড্রাইভার একটি দুর্নীতি পরায়ন কর্মকর্তা-কর্মচারি গোষ্ঠী প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িয়ে হাজার কোটি টাকা কামিয়েছে, দেশের লাখ লাখ তরুণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে তখনো মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিরোধীরা প্রতিবাদে স্বোচ্ছার নয় কেন? লাখো তরুণের ভাগ্যে সীমিত সংখ্যক সরকারি চাকরির সুষ্ঠু ও নায্য বন্টন বিধিতে পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ উত্তরণে দেশের সকলে যখন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পিএসসি’কে ভরসাস্থল গন্য করে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে। পিএসসি’র কাছে নায্যতা আশা করে। তখনো একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পিএসসি’র কর্মকর্তা, কর্মচারি, ড্রাইভারের মত নায়ককেরা গ্রেপ্তার হয়, তরুণদের ভাগ্য অন্ধকার করা এতসব ঘটনা কেন বিচলিত করে না বা করছে না মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের। আজব না?
সরকারি চাকরিতে পোষ্য কোটা আন্দোলনকারীদের চোখে কেন বৈষম্য নয়?
সরকারি ক্যাডার, নন ক্যাডার, বেসরকারি ব্যাংক, বীমা, স্বায়ত্বশাসিত চাকরির স্বপ্ন তো দূরের কথা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পথ আটকে আছে পোষ্য কোটা। মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরাধীরা পোষ্য কোটা ইস্যুটি কি আমলে নেবেন? কারণ স্বপ্নের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষায় ক্ষেত্রে শুন্য দশমিক শুন্য নম্বর কম পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভতির্র সুযোগ বঞ্চিত করে। অথচ এমনও দৃষ্টান্তও আছে যে, ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থী নুন্যতম পাস নম্বর পায়নি-ফেল করেছে তারাও পোষ্য কোটায় ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। সরকারি চাকরিজীবী সন্তানদের জন্য এই যে, পোষ্য কোটার ব্যবহার তা মেধার বৈষম্য নয়? প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারি নিয়োগের ক্ষেত্রে এদেশের সংবিধানের ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে সবার জন্য সমান সুযোগের কথা বলছে। যদিও ২৯ নম্বরের উপঅনুচ্ছেদে পিছিয়ে থাকা সেই অনগ্রসর প্রতিবন্ধী ও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বিশেষ বিধান রেখেছে। কিন্তু সরকারী চাকরিজীবী যাদের বেতন ভাতার সাথে হালের নানান উৎসব ভাতাও দিচ্ছে সরকার। উপরন্ত রয়েছে চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধা, সময়মত বেতন-বোনাসের পাশাপাশি চাকরি শেষে প্রভিডেন্ট ফ্রান্ডের আওতায় এককালীন অর্থ প্রাপ্তি এবং পেনশন সুবিধা।
সরকারি চাকরি মানে-‘সোনার হরিণ’ সেদিক সরকারি চাকরিজীবীরা কোন দিক থেকে সমাজের প্রশ্চাদপৎ যে তাদের সন্তানদের জন্য পোষ্য কোটা বহাল রয়েছে? সরকারি পোষ্য কোটা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের বক্তব্য কি? বড্ড জানতে ইচ্ছা করছে! আবার রেলওয়ের চাকরিতে ১৪ তম গ্রেড থেকে ২০ তম গ্রেডে মোট শুণ্যপদে ৪০ শতাংশ পোষ কোটা এই তথ্য কী মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধীরা জানে? এটা কি বৈষম্য নয়? মো. রোকনুজ্জামান নামে এক আইনজীবীকে ধন্যবাদ তিনি এই বিষয়টি মহামান্য হাই কোর্টের নজর এনেছেন এবং রোববার হাইর্কোটের এক দ্বৈতবেঞ্চ প্রাথমিক শুনানী হয়েছে। বিজ্ঞ ও মাননীয় দুজন বিচারক রেলওয়েতে চাকরির ক্ষেত্রে পোষ্য কোটার এই বিধান সংবিধানের সাথে কেন সাংঘর্ষিক এই মর্মে রুল জারি করেছেন। এতে সংশ্লিষ্ঠদের আগামী ১০ দিনের মধ্যে জবাব দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত। এই যে, ৪০ শতাংশ পোষ্য কোটা এই বিষয়টি মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধীরা কীভাবে দেখছেন বৈষম্য নাকি সমতা উত্তর দেবেন কারা?
জাতীয় নেতা হবার দৌঁড়ে আবারো ব্যবহার হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধী আন্দোলন?
রাজধানীর শাহবাগের রাজপথের চত্তরে মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধীদের আন্দোলন, অবরোধ ও শ্লোগান নিছক স্বাধীনতা বিরোধীদের আস্ফালণে পরিণত হয়েছে। গত কদিনের অবস্থা বিশ্লেষনে এই প্রশ্ন করাটা অসঙ্গত হবে কী? কারণ আদালতে মীমাংসার জন্য থাকা একটি ইস্যুতে উচ্চ আদালত একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথমত: সরকারি চাকরিতে কোটা বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর ১০ জুলাই এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা দিয়েছেন আপীল বিভাগ। দ্বিতীয়ত: ১১ জুলাই সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে গত ৫ জুন হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের মূল অংশ পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করেছেন উচ্চ আদালত। তারপরও কেন মুক্তিযোদ্ধা কোটাবিরোধীরা আন্দোলনে?
উচ্চ আদালত কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীদের কোটা সংস্কারের পথে যেভাবে নানান কর্মতৎপর হয়ে উদ্যোগী হচ্ছেন আন্দোলনকারীদের সেই পথে এগিয়ে চলার কোন উদ্যোম বা আগ্রহ দেখছি না? বরং আন্দোলন জিইয়ে একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা স্বাধীনতা বিরোধী মনোভাব পুঁজি করে তরুণদের আবেগকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন করতে চাই। আর একাজে দেশের বিরুদ্ধে দেশ জাগাতে তরুণদের আবেগের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। বরাবরের মতই একাত্তরের পরাজিত শক্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে স্পর্শকাতর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের বিষয়টি। মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধ শব্দগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে ভূলভাবে উপস্থাপন করে ফায়দা লোটায় কী তাদের উদ্দেশ্য নয়? ঠিক আজ থেকে ৬ বছর আগে ২০১৮ সালে এই কোটাবিরোধী আন্দোলন করে অনেকেই ফেইস ভ্যালু তৈরি করে লাইট লাইমে এসেছিল। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে এদেরই একজন দেশের সবোর্চ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)’র নেতা বনেছেন। এবারো স্থুল মূল্যবোধহীন নব্য দেশপ্রেমীক এমনকি নব্য স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির অবস্থান নিতে আওয়ামী লীগের ছায়াতলে ভীড়ে সত্রিয় হয়েছে সেই পুরানো পাপী একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রতিভূরা।
যারা স্বাধীনতার মূল্য বোঝে না, মুক্তিযুদ্ধ দিনের ভয়াবহতা দেখেনি বাবা, চাচা, দাদার কোলে বসে একাত্তরে স্বজন-প্রিয়জন হারানো। পিতার সামনে কন্যাকে ধর্ষণ, মায়ের বুকে থাকা সন্তানকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাদের বুটে নিচে পিষে মেরেছে-এমন নির্মম বেদনাময় অভিজ্ঞতার কথা আজকের কতজন তরুণ প্রজন্ম জানে? সেই তরুণ প্রজন্মের আবেগ উস্কে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী চেতনা জাগিয়ে ভাগ্য উন্নয়নের শিকারে নেমেছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিরোধী অন্দোলনকারীর কেউ কেউ! আর নাদান মূল্যবোধহীন নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্ত তরুণদের ‘কান নিয়েছে চিলে’ এমন ধারায় পথে নামিয়েছে। যারা মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিরোধী আন্দোলনের নামে নির্ভার হয়ে রাজপথে একাদোক্কা খেলছে। এই দৃশ্য যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয় তখন বলতেই হয় দেশের জন্য এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কিছু হতে পারে কী? ওই তরুণেরা নিজের ভাগ্য উন্নয়ন বহু দূরের, ভবিষ্যতে তারা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কী অবদান রাখতে ভাবুন-তো একবার?
মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কী একমাত্র যখন গলার কাটা
স্বাধীনতার মাত্র ৫৩ বছর যদিও অধিকাংশ বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত হয়েছেন। আবার ১৯৭১-এর ভয়াল অভিজ্ঞতা স্বচক্ষে দেখেছেন তাদেরও একটি বড় অংশ আজ বেঁচে নেই। তারপরও এটাও তো সত্য, সংখ্যায় অল্প হলেও এখনো জীবিত আছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধারা। এমনকি যুদ্ধ দিনের ভয়াবহতা দেখেছেন সেই একাত্তরের ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী বেঁচে আছেন। এছাড়াও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম-তো সেই দাদা, নানা, মামা, চাচার কোলে বসে যুদ্ধ দিনের সব হারানো বেদনার গল্প শুনেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী নানান উত্থান দেখা একাত্তরের পরাজিত শক্তির বিরোধিতার মুখে টিকে থাকা সেই পরের প্রজন্ম তো মরে নাই! তাদের অনেকেই বিজয় ও স্বাধীনতা দিবসে নিজ বাড়িতে বীর মুক্তিযোদ্ধা পিতাকে লাল সবুজের পতাকা উত্তোলন করা, পতাকাকে স্যালুট ও সালামে সম্মান জানাতে পিয় পিতাকে কাঁদতে দেখে বড় হয়েছেন। এতসব ঐতিহাসিক সাক্ষীদের জীবিতাবস্থায় স্বাধীন দেশে একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্থান থেমে নেই। হয়েছে। এর দায় কমবেশি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন এবং রাজনীতিকের রয়েছে। আর এরই সুযোগ নিয়েছে দেশী-ভিনদেশী নানান অপশক্তি আর একাত্তরের পরাজিত পক্ষ।
স্বাধীনতা অর্জনে কোন অবদান না রেখেও বরং বিরোধিতা করে আজ স্বাধীনতার সুফলভোগী ভিরু ও পরাজিত শক্তির প্রতিভূরা বার বার জিতবে তা তো হতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধা কোটা যখন গলার কাঁটা তখন সরকারিভাবে রাজউকের প্লট কিংবা ফ্ল্যাট বরাদ্দে সরকারি চাকরিজীবী, আমলা, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক সাহিত্যিক, সাংবাদিক এত সকল কোটা বহাল কেন? সরকারি চাকরিজীবীসহ সুবিধাপ্রাপ্ত উল্লেখিত শ্রেণী কোন বিবেচনায় পশ্চাৎপদ যে তাদের জন্য কোটার আওতায় ফ্ল্যাট ও প্লাট বরাদ্দ পাবেন? এই কোটায় প্লট ফ্ল্যাট বরাদ্দ সমাজে রাষ্ট্রে বৈষম্য নয়? জেলা শহরে বিভাগীয় পর্যায়ে প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দে কোটা প্রথা বাতিল করুন, না হয় সংযুক্ত করুন স্বাধীন দেশে সাধারণ সংখ্যগরিষ্ঠ সেই কৃষক ও শ্রমজীবী কোটা।
সর্বোপরি রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা অভাব-অভিযোগ এমনকি চাকরিতে বদলি ও পদোন্নতি, নানান নীতি নির্ধারনীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়-সচিবালয়ে প্রবেশে ভিআইপি, সিআইপি, চিকিৎসকসহ নানান পেশাজীবীদের জন্য বরাদ্দ অ্যাক্রিডিটেশন নামে যে কোটার সুযোগ তা অবারিত করে দিন। এতে করে অন্তত সাধারণ শ্রমজীবী ও কৃষকদের যেকোন প্রয়োজনে সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ হয়।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







