মাটি বাঁচলে আমরা বাঁচব

সারা পৃথিবীজুড়ে আমরা মাটির প্রতি অবহেলা, অযত্ন আর নির্মম আচরণ করে চলেছি। মাটির তলা থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খনিজ পদার্থ তুলে নিচ্ছি শুধু অধিক মুনাফার আশায়। যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলছি; পুকুর, নদী, খাল-বিল, হাওর সব ভরাট করে ফেলছি, সর্বত্র আজ মানব সৃষ্ট দূষণের কালো ছাপ।
যুদ্ধ-বিগ্রহ সৃষ্টি করে আমরা ধ্বংস করছি মাটি, প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী, লতাগুল্ম থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ আর সেই সঙ্গে মানুষকেও।
অরণ্য উজাড় করছি, নিশ্চিহ্ন করছি বন্যপ্রাণী, আর প্রতিনিয়ত বিপর্যস্ত করে তুলছি আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে। কলকারখানার বর্জ্য, পাহাড়-পর্বত উড়িয়ে দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড আজ আমাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত কার্বন তৈরি করে জলবায়ু নষ্ট করছি, তাপমাত্রা বাড়িয়ে হিমবাহগুলো গলিয়ে ফেলছি।
গ্রিনহাউস গ্যাসের মাধ্যমে আমরা ধীরে ধীরে পৃথিবীর বাতাস ও পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছি। প্লাস্টিক ও কলকারখানার বর্জ্যে জলাশয়গুলো ভরাট ও দূষিত করছি, মাটিকে করে তুলছি মৃত, বন্ধ্যা ও দুর্গন্ধময়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রকৃতির পরিবর্তন আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে, তবুও আমরা কি যথেষ্ট শিক্ষা নিচ্ছি? মানবসভ্যতা আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি।

এই পরিস্থিতিতে পরিবেশবিদরা এবং পৃথিবীর আদিবাসীরা নিরন্তর সতর্ক করে দিচ্ছেন—“ল্যান্ড-বেজড এডুকেশন” বা ভূমিনির্ভর শিক্ষা এখন সময়ের দাবি। ভূমিনির্ভর শিক্ষা বলতে বোঝায় এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যা মানুষকে প্রকৃতি ও ভূমির সঙ্গে গভীর, আন্তরিক ও দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে শেখায়। এই শিক্ষার মাধ্যমে আমরা শিখি মাটি, জল, বন, প্রাণী ও পরিবেশ আমাদের থেকে আলাদা কিছু নয়; এগুলো আমাদের জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃতির সঙ্গে কীভাবে সহাবস্থান করতে হয়, কীভাবে তাকে ভালোবাসতে হয় এবং কীভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাকে নিরাপদ রাখতে হয় ভূমিনির্ভর শিক্ষা আমাদের সেই পথ দেখায়।
পৃথিবীর আদিবাসী মানুষদের কাছ থেকে আমাদের শিখতে হবে, তাদের কথাও আমাদের স্মরণ করতে হবে যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মাটি, জল, বন ও প্রকৃতিকে নিজেদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আগলে রেখেছেন। নিজেদের ভূমি, জল ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে গিয়ে অনেকেই জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন।
তাঁদের সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয় মাটি ও জল শুধু কোনো সম্পদ নয়; এগুলো আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ। তাঁদের এই আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম থেকে আমাদেরও শিখতে হবে, কীভাবে প্রকৃতিকে ভালোবেসে,সম্মান ও যত্ন করে বেঁচে থাকতে হয়।
মাটি থেকেই প্রকৃতির প্রতিটি জীবকণার জন্ম। মৃত্যুর পর আমাদের দেহ এবং প্রকৃতির প্রতিটি জীবকণা আবার সেই মাটিতেই মিশে যাবে। আমরা মাটির বুক থেকে পাওয়া খনিজ, লবণ ও পানি গ্রহণ করেই বেঁচে থাকি। আমাদের খাদ্য, পানি, অক্সিজেন সবকিছুই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই প্রকৃতি থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন নই; বরং প্রকৃতিরই একটি অংশ। মানুষ আসলে মাটিরই সন্তান। মানুষ ও মাটিকে কখনো আলাদা করা যায় না।
মাটির বুকেই গাছপালা জন্ম নেয়, ফুল ফোটে, ফসল ফলে। সেই ফুলের সুগন্ধে যেমন ভরে ওঠে আমাদের চারপাশ, তেমনি প্রকৃতির সৌন্দর্য আমাদের মনকেও ভরে দেয় প্রশান্তিতে। মাটি আমাদের শুধু শরীরের প্রয়োজন মেটায় না; এটি আমাদের মন ও আত্মাকেও শান্তি দেয়। মাটি আমাদের শুধু জীবন দেয় না, দেয় বেঁচে থাকার অর্থ, দেয় আমাদের অস্তিত্বের শিকড়।
ধুলো-বালিতে মাখামাখি না হলে, মাটির গন্ধ অনুভব না করলে, প্রকৃতির সত্যিকারের সান্নিধ্য আমরা কীভাবে বুঝব? মানুষের জীবনে মাটি কোনো সাধারণ বস্তু নয়। মাটি আমাদের ভিত্তি, আমাদের আশ্রয়, আমাদের পরিচয়। আমাদের শিকড় যেখানে প্রোথিত, সেই মাটিই আমাদের সবচেয়ে আপন।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ আমরা সেই জীবনের ভিত্তিকেই অবহেলা করছি। নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তুলছি। মাটি কাউকে দুঃখ দেয় না, কাউকে ঠকায় না, কারও প্রতি অন্যায় করে না। অথচ আমরা আমাদের প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে সেই মাটির ওপরই নির্মম অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছি।
আমাদের চারপাশের গাছপালা, ফুল-পাখি, কীটপতঙ্গ প্রকৃতির এই ছোট ছোট প্রাণগুলোর কথা যেন আমাদের ভাবনাতেই নেই। আমরা ভুলে যাচ্ছি, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি জলধারা এবং মাটির প্রতিটি কণাই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অথচ আমরা কেবল নিজের সুবিধা, স্বার্থপরতা ও ভোগের কথাই ভাবছি।
আমরা মাটি, পানি ও বায়ু সবকিছু ধ্বংস করছি শুধু নিজেদের আরাম ও আয়ের জন্য। কিন্তু একবার কি আমরা ভেবে দেখেছি আজ যে পৃথিবীকে আমরা নিজেদের স্বার্থে ক্ষতবিক্ষত করছি, সেই পৃথিবীটাই তো আমাদের সন্তানদের বেঁচে থাকার আশ্রয়?
এটা শুধু অবহেলা নয়; এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক ভয়ংকর অন্যায়। আমরা হয়তো আজ সবকিছু ভোগ করে যেতে পারব, কিন্তু আমাদের পরের প্রজন্ম কী পাবে? একটি সবুজ পৃথিবী, নাকি বিষাক্ত বাতাস, দূষিত পানি আর মৃত মাটি?
মনে রাখতে হবে আমাদের একটাই পৃথিবী। এর কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীকে ধ্বংস করে আমরা কোথাও পালিয়ে যেতে পারব না। এই মাটিই আমাদের আশ্রয়, এই প্রকৃতিই আমাদের জীবন।
তাই চলুন, সকলে মিলে স্বার্থপরতার এই অন্ধ পথ থেকে বের হয়ে আসি। আসুন, মাটিকে ভালোবাসি, মাটির যত্ন করি, প্রকৃতিকে রক্ষা করি। ঠিক যেমন আমরা নিজের সন্তানকে ভালোবাসি এবং তার ভবিষ্যৎ সুন্দর করার জন্য যত্ন নিই, তেমনি আমাদের এই পৃথিবীকেও ভালোবাসি ও যত্ন করি।
কারণ আমাদের সন্তানদের জন্য আমরা যেমন একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ চাই, তেমনি সেই ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্থ পৃথিবীও প্রয়োজন।
আসুন, আমরা মাটিকে ভালোবাসি, তাকে সম্মান করি এবং যত্ন নিই ঠিক যেমন করে আমরা নিজেদের শরীরের যত্ন নিই। কারণ মাটির যত্ন নেওয়া মানে শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনকেই রক্ষা করা।
মাটি বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। আর পৃথিবী বাঁচলেই, বেঁচে থাকবে আমাদের আগামী প্রজন্ম।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






