নীতিনির্ভর গবেষণা, সুশাসন উদ্ভাবন এবং নাগরিক রূপান্তরে অবদান রাখার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে ইনসাইট ফর চেঞ্জ ফাউন্ডেশন (আইসিএফ)। আইসিএফ নিজেদের একটি পলিসি রিসার্চ, গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ও সিভিক ট্রান্সফরমেশন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। সংগঠনটির লক্ষ্য বাংলাদেশের জন্য তথ্য-উপাত্তভিত্তিক, বাস্তবসম্মত এবং জাতীয় প্রেক্ষাপটসংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করা।
রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে আইসিএফের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নওফেল জমির বলেন, ‘জাতীয় রূপান্তর শুরু হয় পরিষ্কার চিন্তা, সৎ সমস্যাবিশ্লেষণ এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ থেকে। বাংলাদেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে নীতিনির্ধারণকে আরও প্রমাণভিত্তিক, কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন উন্নত নাগরিক মানসিকতা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং তথ্য-উপাত্তভিত্তিক নীতিগত সিদ্ধান্ত।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। বিশেষ অতিথি ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। ব্যারিস্টার নওফেল জমিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নওশাদ জমির এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. এম এ মুহিত বলেন, গণতন্ত্রহীনতার চর্চা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটের কারণে দেশের সামাজিক মূল্যবোধের ঐতিহ্যগত কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দুর্নীতি সমাজে একধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্মের একাংশের মধ্যে সম্মানিত ব্যক্তিদের অসম্মান করাকে সাহসিকতা বা স্মার্টনেস হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা উদ্বেগজনক।’
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল- এ জ্ঞান থাকলেই পরিবর্তন আসে না। এর জন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা ও জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন। রাস্তাঘাটে থুতু বা পানের পিক ফেলার মতো নেতিবাচক অভ্যাস দূর করতে বিচার বা শাস্তির চেয়ে সামাজিক আন্দোলন বেশি কার্যকর হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. এম এ মুহিত বলেন, দেশে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বলতে সাধারণত হাসপাতাল বা আইসিইউ বেড বাড়ানোকে বোঝানো হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বর্তমান বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, খাদ্যকে ভেজালমুক্ত করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত শরীরচর্চা স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকরা যদি প্রতিদিন অন্তত ৪০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করেন, তাহলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট ও কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, মানুষের সামাজিক মূল্যবোধ ও আচরণগত ইতিবাচক পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
তিনি জানান, জনসচেতনতা তৈরিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও ও রিলস তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হবে। এতে নারীর প্রতি সম্মান, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নৈতিকতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
তিনি বলেন, পশুপাখির প্রতি মমত্ববোধ সৃষ্টি, সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতেও কাজ করবে সরকার। যত্রতত্র থুতু ফেলা ও ময়লা-আবর্জনা না ফেলার মতো মৌলিক নাগরিক আচরণ গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে আইসিএফ দুটি নীতিগত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করে। এর মধ্যে প্রথমটি ‘ন্যাশনাল অ্যাওয়ারনেস অ্যান্ড সিভিক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (এনএসিডিআই)। নাগরিক আচরণ, নৈতিক মানদণ্ড এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি জাতীয় কাঠামো হিসেবে এ প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।
প্রস্তাবনায় বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনা, দুর্নীতি, হয়রানি, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পরিবেশ দূষণ এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতার মতো বহু সমস্যা আচরণগত ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
দ্বিতীয় প্রস্তাবনা ছিল ‘প্রায়োরিটাইজিং হেলথ সেক্টর রিফর্ম ইনিশিয়েটিভস ইন বাংলাদেশ’। এতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে কোন সংস্কার উদ্যোগগুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত, তা গবেষণাভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আইসিএফের মতে, দেশের বড় অনেক সমস্যার সমাধান শুরু হতে পারে আচরণগত পরিবর্তন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে। সংগঠনটি আশা প্রকাশ করেছে, নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক দল, গবেষক, পেশাজীবী এবং নাগরিক সমাজ এসব প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ‘একটি আলোকিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করা’। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে তারা ‘একটি সামাজিক বিপ্লব’-এর কথা বলেছে, যা নাগরিক মূল্যবোধ, সুশাসন এবং জাতীয় চরিত্রের ইতিবাচক পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।

