‘মেট্রোসেম স্ট্রেট কাট’ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সাথে এই সাক্ষাৎকারের তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ১০০ ভাগ ধারণ করি। শুরুতেই ১৯৭১ এবং ২০২৪ এর নতুন স্বাধীনতা বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘দেখেন এর আগে আরেকটা স্বাধীনতা আমরা পেয়েছিলাম ১৯৪৭ সালে। এর আগে ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আমাদের এই উপমহাদেশ শোষণ করেছিলো ব্রিটিশরা। তখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অনেকগুলো আন্দোলন হয়েছে। সিপাহি বিদ্রোহ থেকে শুরু করে অনেক কিছুই হয়েছে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে অখণ্ড ভারত দুই ভাগে বিভক্ত হয়, ইন্ডিয়া এবং পাকিস্তান।
সম্প্রতি চ্যানেল আই এর ‘মেট্রোসেম স্ট্রেট কাট’ অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম এর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন তারুণ্যদিপ্ত উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরী। অনুষ্ঠানে তিনি খোলাখুলি কথা বলেছেন জামায়াতে ইসলামের রাজনীতি, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান নিয়ে।
কয়েক ঘণ্টা আগে হওয়ার কারণে আমরা আগে স্বাধীন হয়েছিলাম, অন্যদিকে কয়েক মিনিট এদিক ওদিক হবার কারণের ইন্ডিয়াকে বলা হয় তারা ১৫ আগস্ট স্বাধীন হয়েছে। সে স্বাধীনতা একটা থিমকে সামনে রেখে হয়েছিলো। বিশেষ করে আমি পাকিস্তানের কথা বলছি। তারা বলেছিলেন আমাদের একটা স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রয়োজন। কেন প্রয়োজন?
তারা ১৯০ বছর বৃটিশ শোষণের জাতাকলে পিষ্ট হয়ে তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে মুসলমানেরাই কার্যত ভারতের সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত, অবহেলিত ছিলেন। এই জায়গা থেকেই তারা অনুভব করেছিলেন যে একটা মুসলিম রাষ্ট্র কায়েম হওয়া দরকার। তারা কথা দিয়েছিলেন এমন একটা রাষ্ট্র কায়েম হলে সেই দেশটা চলবে কুরআনের সংবিধান অনুযায়ী। কিন্তু এইটা তারা করেন নাই। না করার কারণে তারা কার্যত এটার সুবিচার নিশ্চিত করতে পারেন নাই।
সর্বশেষ ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন যেটা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, ৩০০ আসনের মধ্যে যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস করতো এবং এদেশের নাগরিক ছিলো সে কারণে ১৬৩ টি আসন ছিলো পূর্ব পাকিস্তানে। বাকি ১৪৭টি আসন ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানে। এই ১৬৩ আসনের মধ্যে ১৬১টি আসন আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছিলো। সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন পূর্বপাকিস্তানে হওয়া সত্ত্বেও তারা কিন্তু পুরো পাকিস্তানেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলো। সেই সময়ে ভুট্টো সাহেবের আজগুবি দাবি উদ্ভট চিন্তা এবং হঠকারিতার কারণে তিনি শেখ মুজিব সাহেবের নেতৃত্ব সারা পাকিস্তানে মেনে নিতে রাজি হলেন না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো কি না, এ বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন ‘যুদ্ধটাতো পাকিস্তানিদের চাপিয়ে দিয়েছিলো। পশ্চিম পাকিস্তানিরা এবং সামরিক শাষণের ব্যর্থতার কারণে যুদ্ধ করা ছাড়া তো আর কোন উপায় ছিলো না। কিন্তু যুদ্ধেও প্রেক্ষাপট এতটাই জটিল হয়ে গেলো, যখন এই যুদ্ধে সরাসরি ভারত আশ্রয় এবং সাপোর্ট দিতে লাগলো তখন, আমি তখন সেই দল সাপোর্ট করতামও না আর আমার বয়েসও তত ম্যাচিউর ছিলো না। আমি বলতে গেলে একজন শিশু ছিলাম। অল্প অল্প যা বুঝতাম তখন যা বুঝেছি যে বাংলাদেশে অসংখ্য ধর্মীয় দল বা মুসলিম জাতিয়তাবাদি ইসলামিক দল ছিলো। এর মাঝে জামায়াতে ইসলাম একটা। জামায়াতে ইসলামের নীতি আদর্শ বক্তব্য এই দলগুলোর মধ্যে একটু বেটার মনে হয়েছে বলে অল্প কিছু ভোট মানুষ জামায়াতে ইসলামকে দিয়েছে। অন্যকেউ তেমন কিছু পায়নি বললেই
চলে। বাকি সকল ভোটই পেয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘তাজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন তার ঘনিষ্টতম ব্যক্তি। তার মেয়ের লেখা বই, নেতা ও পিতা। আপনি নিশ্চয়ই পড়েছেন আমি বিশ্বাস করি, যদি না পড়ে থাকেন তবে পড়ে দেখবেন। শেখ মুজিব সাহেবের কাছে একটা ড্রাফট নিয়ে গিয়েছিলেন তাজউদ্দিন সাহেব। যে নেতা আপনি এটাতে স্বাক্ষর করেন। তাহলে আপনার স্বাক্ষর করা এই লেখা আমরা সব জায়গায় পৌঁছে দিতে পারবো। দেশি বিদেশি মিডিয়ার কাছে। শেখ মুজিব রাজি হননি। শেষ মুহূর্তেও রাজি না হওয়ার কারণে তাজউদ্দিন মন ভাঙ্গা অবস্থায় সেই ৩২ নম্বর ত্যাগ করে তিনি চলে এসেছিলেন। এর প্রতিবাদ তো আওয়ামী লীগ করেনি। এবং তাজউদ্দিন সাহেবের ফ্যামিলি তো এখনও আওয়ামী লীগের সাথে আছে। আওয়ামী লীগেরই রাজনীতি করে। তার এক মেয়ে তো আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। এর আগে ছেলে ছিলেন। তিনি তো প্রতিমন্ত্রিও ছিলেন। প্রতিমন্ত্রির দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। বই তো ওই সময়েই লেখা। সে বইয়ের প্রতিবাদ তো আওয়ামী লীগ করেনি। তো আমি বলবো কেন! তাদেও নিজেদের সাক্ষিই তো তাদের নিজেদের জন্য যথেষ্ট।’
জামায়াতে ইসলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কতটা ওউন করেন, সেই প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা ১০০ ভাগ ওউন করি। শুধু ওউন করি না। স্বাধীন এই দেশের জন্য সম্ভবতঃ আমাদের মতো এত বেশি মূল্য পরিশোধ কারো কারো করতে হয়নি। আমরা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব কারো কাছে বিক্রি হোক এটা আমি চাই না।’
বাংলাদেশের ২৪ এর নতুন স্বাধীনতা এবং আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামের ভ‚মিকা বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এ আন্দোলনটা আসলে কোন দলের নয়, আসলে কোন গোষ্ঠিরও নয়। এ আন্দোলন ছিলো আপামর নির্যাতিত জনগনের আন্দোলন। তবে হ্যাঁ, এ আন্দোলন যে ২০২৪ এ এসে হয়েছে বিষয়টি এমন নয়। এ আন্দোলন শুরু হয়েছে আরেকটা রক্ত পরিশোধের একটা বেদনাদায়ক ঘটনার মধ্য দিয়ে। সে ঘটনাটা আপনারা জানেন যে ২০০৯ সালের ১০ জানুয়ারী আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে, ঠিক পরের মাসে, ২৬ এবং ২৭ ফেব্রয়ারি পিলখানায় যে ৫৭ জন কমিটেড চৌকষ সেনাকে হত্যা করা হয়েছিলো, তার মধ্য দিয়ে হত্যার রাজনীতি শুরু হয় আর এই জাতির ত্যাগের রাজনীতি শুরু হয়। এই যে ১৫ বছর আগে বা সাড়ে ১৫ বছর আগে দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনির এতগুলো চৌকষ সেনা হত্যা করা হয়েছিলো এবং তার পরের বছর জামায়তে ইসলামের নেতৃবৃন্দকে যেভাবে ফাসেকের ট্রায়ালে নিয়ে ক্যাঙ্গারু কোর্টে অন্যায় ভাবে ফাঁসি দেয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশের জনগণ গোটা দেশবাসি দেখেছে। রিপিটেডলি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশ তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে সরকারকে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








