লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির সবচেয়ে আলোচিত ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফিকে নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়। সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া-এর বরাতে জানা গেছে, চারজন হামলাকারী এই হামলা চালায়। নিহত সাইফ আল-ইসলামের বয়স ছিল ৫৩ বছর।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ১৩৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে জিনতান শহরে নিজ বাসভবনের বাগানে তাকে গুলি করা হয়। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় হামলাকারীরা গুলি চালানোর পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। গাদ্দাফি পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, হামলার আগে বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরা অকেজো করা হয় এবং পরে সাইফ আল-ইসলামকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। তবে সাইফ আল-গাদ্দাফির এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী একে সরাসরি হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সাইফ গাদ্দাফির রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও ২০২০–২০২১ মেয়াদে তার রাজনৈতিক দলের সদস্য আবদুল্লাহ ওসমান ফেসবুকে এক পোস্টে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি লেখেন, আমরা আল্লাহর এবং তার কাছেই প্রত্যাবর্তনকারী। মুজাহিদ সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি এখন আল্লাহর আশ্রয়ে।
২০১১ সালে ন্যাটো-সমর্থিত গণঅভ্যুত্থানে মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসন পতনের পরও সাইফ আল-ইসলাম লিবিয়ার রাজনীতিতে আলোচিত ও প্রভাবশালী চরিত্র হিসেবে রয়ে যান।
সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফির জীবন ও রাজনৈতিক উত্থান-পতন
একসময় বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি পরে দীর্ঘ এক দশক বন্দিদশা ও রাজনৈতিক আড়ালে কাটান। তবুও তিনি লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে দেশটির রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বড় ধরনের অচলাবস্থায় ফেলে দেন।
কোনো সরকারি পদে না থেকেও তিনি একসময় তেলসমৃদ্ধ উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন হিসেবে বিবেচিত হতেন। চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশ শাসন করা তার বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পর তিনিই ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী মুখ।
সাইফ আল-ইসলাম নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনায় মধ্যস্থতা করেন। তার নেতৃত্বেই লিবিয়া গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগের আলোচনা এগোয় এবং ১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের লকারবিতে প্যান অ্যাম ফ্লাইট ১০৩ বিস্ফোরণে নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ চুক্তি হয়।
লিবিয়াকে আন্তর্জাতিক একঘরে অবস্থা থেকে বের করে আনতে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সংবিধান প্রণয়ন ও মানবাধিকার সম্মানের পক্ষে কথা বলে নিজেকে সংস্কারক হিসেবে তুলে ধরেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে শিক্ষিত ও ইংরেজিতে দক্ষ সাইফ আল-ইসলামকে একসময় পশ্চিমা বিশ্বের কাছে লিবিয়ার গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে দেখা হতো।
তবে ২০১১ সালে গাদ্দাফির দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হলে তিনি পরিবার ও গোত্রগত আনুগত্যকেই অগ্রাধিকার দেন। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন অভিযানের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হয়ে ওঠেন তিনি, বিদ্রোহীদের ‘ইঁদুর’ বলে আখ্যা দেন।
সে সময় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আমরা লিবিয়াতেই লড়াই করব, লিবিয়াতেই মরব।
বিদ্রোহীরা ত্রিপোলির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সাইফ আল-ইসলাম বেদুইন সেজে প্রতিবেশী নাইজারে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে মরুভূমির এক সড়কে আবু বকর সাদিক ব্রিগেডের যোদ্ধারা তাকে আটক করে এবং জিনতানে নিয়ে যায়। তার বাবাকে বিদ্রোহীরা ধরে এনে হত্যার প্রায় এক মাস পরই তিনি আটক হন।
পরবর্তী ছয় বছর তিনি জিনতানে বন্দি ছিলেন। এটি ছিল তার আগের বিলাসী জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত যে জীবনে তিনি পোষা বাঘ পুষতেন, বাজপাখি দিয়ে শিকার করতেন এবং লন্ডনে ব্রিটিশ অভিজাত সমাজে ওঠাবসা করতেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সঙ্গে সাক্ষাতে সাইফ আল-ইসলাম জানান, তিনি দীর্ঘদিন বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন এবং খুব কমই দর্শনার্থী পেতেন। তখন তার একটি দাঁতও ভাঙা অবস্থায় ছিল।
২০১৫ সালে ত্রিপোলির একটি আদালত তাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০১৭ সালে সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি পেলেও হত্যার আশঙ্কায় তিনি দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকেন।
২০২১ সালে ঐতিহ্যবাহী লিবীয় পোশাক ও পাগড়ি পরে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাবহায় হাজির হয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আবেদন জমা দেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছিল, ২০১১ সালের আগে তুলনামূলক স্থিতিশীল সময়ের স্মৃতিকে কাজে লাগাতে চাইবেন তিনি।
তবে তার প্রার্থিতা ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। গাদ্দাফি শাসনের সময় নির্যাতনের শিকার অনেকেই এর বিরোধিতা করেন। ২০১১ সালের বিদ্রোহ থেকে উঠে আসা প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও তার প্রার্থিতা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।
শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালের দণ্ডের কারণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। তিনি আপিল করতে গেলে আদালত প্রাঙ্গণ ঘিরে ফেলে সশস্ত্র যোদ্ধারা। এসব বিরোধ ও অচলাবস্থার মধ্যেই ২০২১ সালের নির্বাচনী প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে এবং লিবিয়া আবারও রাজনৈতিক স্থবিরতায় ফিরে যায়।







