পাকিস্তানের সামরিক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান হিসাবে অ্যাডজুটান্ট জেনারেল পদে কর্মরত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহম্মদ আসিম মালিককে নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের সরকারি গণমাধ্যম। নতুন প্রধান নিয়োগের খবরের সঙ্গেই এই গুপ্তচর সংস্থাটি কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
আজ (৩০ সেপ্টেম্বর) সোমবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, আইএসআই-এর মূল দায়িত্ব দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহারিক ও আদর্শগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গুপ্তচর সংস্থাটির নাম- ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআই। নামের মধ্যেই এর মূল দায়িত্ব প্রতিফলিত হয়। বেসামরিক অফিসারেরাও আইএসআইয়ের উচ্চ পদে থেকেছেন, কিন্তু সংস্থাটির সাংগঠনিক কাঠামোতে তাদের বিশেষ আধিপত্য দেখা যায় না।
আইএসআই
জার্মান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. হিন এইচ কিসলিং ১৯৮৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে থেকেছেন। তার বই ‘আইএসআই অব পাকিস্তান’-এ সংস্থাটির সাংগঠনিক কাঠামো তুলে ধরে লিখেছেন, এটি একটি আধুনিক সংস্থা, যার কাজ মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা।
আইএসআইয়ের সাংগঠনিক কাঠামোতে সেনাবাহিনীরই আধিপত্য থাকে, যদিও নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর অফিসাররাও এই সংগঠনের অংশ। আইএসআই-র মহাপরিচালকই বিদেশি গুপ্তচর সংস্থা সমূহ এবং ইসলামাবাদের দূতাবাসগুলিতে নিযুক্ত সামরিক অ্যাটাশেদের সঙ্গে যোগাযোগের মূল মাধ্যম হিসাবে কাজ করেন। একইভাবে তিনি পর্দার আড়ালে থেকেই প্রধানমন্ত্রীর গোয়েন্দা বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন।
একজন সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনীর মতো সশস্ত্র বাহিনীগুলোতে নিজস্ব গোয়েন্দা বিভাগ থাকে। এই বিভাগগুলো নিজেদের বাহিনীর প্রয়োজনমাফিক গোপন তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। আইএসআই এবং তিনটি সামরিক বাহিনীর নিজস্ব গোয়েন্দা বাহিনী অনেক সময়ে একই ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে থাকে কারণ সবকটি গোয়েন্দা সংস্থাই সামরিক গতিবিধি আর শত্রুর ওপরে নজরদারি চালায়।
তবে সামরিক বাহিনীগুলোর অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার তুলনায় আইএসআইকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সবচেয়ে শক্তিশালী গুপ্তচর সংস্থা বলে বিবেচনা করা হয়। আইএসআই দেশটির সবচেয়ে বড় গুপ্তচর সংস্থা হলেও সেখানে কত কর্মী আছেন, তা নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যম বা বেসরকারিভাবে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য নেই। আইএসআইয়ের বাজেট বরাদ্দও কখনও জনগণের সামনে আনা হয়নি।
তবে কয়েক বছর আগে ওয়াশিংটন-ভিত্তিক ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টের চালানো এক তদন্ত অনুযায়ী, আইএসআইতে ১০ হাজার অফিসার ও কর্মচারী রয়েছেন। যারা খবরাখবর সংগ্রহ করেন বা নিজে থেকেই গোয়েন্দাদের খবর দেন তারা এই কর্মী সংখ্যার মধ্যে নেই। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আইএসআইতে ছয় থেকে আটটি বিভাগ রয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইএসআইয়ের সাংগঠনিক কাঠামো এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যাতে এটিকে এমন একটি গুপ্তচর সংস্থায় পরিণত হয়েছে, যারা মূলত কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের দিকেই মনোনিবেশ করে থাকে।
সামরিক বিষয়ের অভিধানে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে এভাবে- ‘বিদেশি সরকার, বিদেশি সংস্থা, বিদেশি ব্যক্তি বা আন্তর্জাতিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি বা তাদের নির্দেশে যেসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তার ওপরে পাল্টা নজরদারি চালানো।’

কিন্তু কেন আইএসআই কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স বা পাল্টা গোয়েন্দাগিরির ওপরে এত বেশি নজর দেয়?
আইএসআইয়ের মধ্যে যে ডিরেক্টরেট বা অধিদপ্তরটি কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের দায়িত্ব সামলায়, তার নাম জয়েন্ট কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো বা জেসিআইবি। এটিই আইএসআইয়ের বৃহত্তম ডিরেক্টরেট।
এই বিভাগটির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে বিদেশে কর্মরত পাকিস্তানি কূটনীতিকদের ওপর নজরদারি করা। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, চীন, আফগানিস্তান ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া দেশগুলোতে গুপ্তচরবৃত্তি চালানোও এই বিভাগের কাজ।
কিসলিংয়ের কথায়, জেসিআইবির চারটি অধিদপ্তর রয়েছে, যার প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা দায়িত্ব রয়েছে। এই বিভাগগুলো হল:
- বিদেশী কূটনীতিক ও বিদেশিদের ওপরে ব্যক্তিগতভাবে নজরদারির কাজ একজন পরিচালকের অধীনে করা হয়।
- আরেকজন পরিচালকের দায়িত্ব অন্য দেশের রাজনীতি সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা।
- এক পরিচালকের দায়িত্ব এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা।
- একজন পরিচালক গোয়েন্দা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এটিই আইএসআইয়ের সবথেকে বড় অধিদপ্তর। এই বিভাগটির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আইএসআই কর্মকর্তাদের ওপরেও নজরদারি চালানো।
এই বিভাগের কাজের মধ্যে আছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করা। পাকিস্তানের সব বড় শহর অঞ্চলে এই বিভাগের কার্যালয় আছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় কাজ করে আইএসআই
একজন অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তার মতে, আইএসআই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় কাজ করে। এর ফলে তারা প্রভূত সামরিক শক্তিতে বলীয়ান। তবে তিনি এও বলছেন যে আইএসআই এবং সেনাবাহিনীর সম্পর্কের মধ্যে কখনও কখনও ফাটল ধরেছে, তা প্রকাশ্যেও এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “সামরিক বিশেষজ্ঞরা উদাহরণ তুলে ধরে বলেছেন, ১৯৯৯ সালের ১২ই অক্টোবরের বিদ্রোহ শুধু নওয়াজ শরিফ সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না, তা আইএসআই সংস্থার বিরুদ্ধেও ছিল।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, “আইএসআইয়ের মিডিয়া শাখা মাঝে মাঝে স্বাধীনভাবে কাজ করে যেটা আবার সামরিক বাহিনীর মিডিয়া শাখা আইএসপিআরের কাজকর্মের উদ্দেশ্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।“
তিনি বলেন, “আইএসপিআর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ ইউনিট। গণমাধ্যমের ওপর এই ইউনিটের চাপ থাকে, আবার আইএসআইয়ের মিডিয়া শাখার চাপও সমান্তরালভাবে চলতে থাকে।“







