ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানে ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পূর্বাঞ্চলের ১১টির জেলার প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। গত ২০ আগস্ট থেকে তিন দিনে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ১৩ জন।
ইতিমধ্যে দেশের নদ-নদী গুলোর কয়েকটি বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষ বন্যা দেখেনি।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী ২৪ ঘন্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এসময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই, ধলাই নদী সমূহের সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
প্রতি মাসের শুরুতে আবহাওয়া অধিদপ্তর ওই মাসের আবহাওয়া পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দেয়। আগস্টের শুরুতে সেই পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, এ মাসে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতিবৃষ্টির কারণেই এ বন্যা হবে বলে জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে এখন উত্তর-মধ্যাঞ্চলের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদপ্তর ১৬ আগস্ট জানিয়ে দিয়েছিল খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হবে। দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেও বলা হয়েছে স্বল্পমেয়াদি বন্যার কথা। দেশের নদীগুলোর বেশির ভাগের উৎপত্তি পূর্বাঞ্চল ও উত্তর পূর্বাঞ্চলে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বন্যার বিষয়ে বন্যা সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্র তথ্য দিয়ে থাকে। তারা পাশের দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব তথ্য দিয়ে থাকে।’
বন্যা সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, ‘এটা হচ্ছে ফ্ল্যাশ ফ্লাড (আকস্মিক বন্যা)। এটি নিয়ে খুব বেশি আগে উজান থেকে তথ্য পাওয়া যায় না। এটার সময় থাকে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা। সেসব তথ্য পাওয়া গেছে।’
তিনি বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখাচ্ছে ভারী বৃষ্টি কমে যাবে। আশা করা যাচ্ছে, আজকে পানি স্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে। কাল থেকে পানি কমা শুরু হতে পারে। পরবর্তী সময় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীসমূহের পানি সমতল ধীর গতিতে হাস পাচ্ছে। বিগত ২৪ ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চলীয় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনী জেলার ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা প্রদেশের অভ্যন্তরীণ অববাহিকাসমূহে ভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়নি এবং উজানের নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস পাওয়া শুরু হয়েছে। ফলে বর্তমানে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির ধীর গতিতে উন্নতি হচ্ছে।
আরও বলা হয়, আবহাওয়া সংস্থাসমূহের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘন্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এ সময় এ অঞ্চলের ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার মুহুরী, ফেনী, গোমতী, হালদা ইত্যাদি নদীসমূহের সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
আজ শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লা ও ফেনী অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কিছুটা কমার কথা জানিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে সার্বিকভাবে চট্টগ্রাম বিভাগে আরও ৭২ ঘণ্টা কম-বেশি বৃষ্টিপাত থাকবে।
আবহাওয়াবিদ মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টিপাত কমার কথা যেটি বলা হয়েছে, সেটির অর্থ হলো-কোথাও কোথাও একটু কমবে, আবার বাড়বে।২৮ আগস্টের পর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টিপাত আবার কিছুটা বাড়বে।’
পরিবেশ ও জলাবায়ু পরিবর্তন আন্দোলন (পরিজা) বলছে, বৃষ্টিপাতের প্রভাবে পাহাড়গুলোর ভূমিস্তর খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বিগত যেকোনো বছরের তুলনায় এই সময়ে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এটা আরো কিছুদিন চলবে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে। তাই এই মুহূর্তে বন্যার পাশাপাশি পাহাড় ধ্বসের প্রকট আশংকা দেখা দিয়েছে।বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের এই মুহূর্তে আশুকরণীয় হলো পার্বত্য জেলাসহ সব ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর ওপরে, পাদদেশে বসবাসকারী জনসাধারণকে নিরাপদে সরিয়ে আনা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, দেশের বিভিন্ন জেলার চলমান আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার সম্মিলিতভাবে সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করছে। সবার সহায়তায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দুর্গম এলাকাগুলো থেকে মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে আগত মানুষের সেবায় সরকারের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করায় আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি।








