কলম্বিয়ার অ্যামাজন জঙ্গলে একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার প্রায় ৪০ দিন পর বেঁচে ফিরেছে উড়োজাহাজে থাকা একই পরিবারের চার ভাই-বোন। অলৌকিক ভাবে বেঁচে ফেরার পর দীর্ঘ ৪০ দিন বেঁচে থাকার সংগ্রামের অভিজ্ঞতা জানিয়েছে তারা। স্থানীয় আদিবাসী এবং সেনাবাহিনী মিলে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করে এই চার শিশুকে।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার কলম্বিয়ার অ্যামাজন জঙ্গলে নিখোঁজ ৪জন শিশুকে জীবিত খুঁজে পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। তিনি বলেন “সারা দেশের জন্যই এটি আনন্দের সংবাদ।” চার ভাই-বোনকে জঙ্গল থেকে উদ্ধারের পর হেলিকপ্টারে করে তাদের রাজধানী বোগোটার সেন্ট্রাল মিলিটারি হাসপাতালে নিয়ে আসে কলম্বিয়ার সেনা সদস্যরা। আর সেখানেই পরিবারের সাথে মিলিত হয় তারা।
যেভাবে এই দুর্ঘটনা
গত পহেলা মে মা ম্যাগডালিনা মুকুতুই ভ্যালেন্সিয়া নামক একজন নারী তার চার সন্তানসহ ছোট একটি উড়োজাহাজে চেপে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হন। কিছুক্ষন পর উড়োজাহাজটি অ্যামাজন জঙ্গলে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় শিশুদের মা ও পাইলটসহ তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক মারা যান। প্রায় দুই সপ্তাহ পর তাদের উদ্ধার করা গেলেও খোঁজ মেলেনি সেখানে থাকা ১১ মাস বয়সী নবজাতকসহ ১৩, ৯ এবং ৪ বছর বয়সী শিশুদের।

উদ্ধার অভিযান
সহোদর শিশুদের কোন সন্ধান পাওয়া না গেলেও বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত উদ্ধারকারী কুকুর তাদের পানি খাওয়ার একটি বোতল শনাক্ত করে।এরপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আধ খাওয়া ফল, জামা কাপড়সহ বিভিন্ন প্রাণের অস্তিত্ব ধরা পড়তে থাকে উদ্ধারকারীদের চোখে। এরপর জঙ্গলে বসবাসকারী আদিবাসী ও সেনাবাহিনীর প্রায় একশোর সদস্য অভিযান চালায়। জঙ্গলেই বানানো একটা থাকার জায়গা চোখে পড়ে উদ্ধারকারী দলের। এছাড়া কাঁচি, চুলের ফিতা, টাওয়েল ও জুতারও খোঁজ মেলে।

তবে তৃতীয় সপ্তাহে এসে দুটি ব্যবহৃত ডায়াপার ও পায়ের ছাপ দেখে আর্মি নিশ্চিত হয় দুর্ঘটনায় বাচ্চারা মারা যায়নি, তবে বিভিন্ন ক্লু দেখে মনে হয় তারা ‘৩ থেকে ৮ মে’র মধ্যে’ জায়গাটা ত্যাগ করেছে। উদ্ধারকারী দল বিমান থেকে জঙ্গলের ভেতর স্প্যানিশ ও হুইতুতো ভাষায় লেখা বার্তা ফেলতে থাকে, যেন বাচ্চারা একসাথে থাকে এবং বিভিন্ন দিকে ঘোরাফেরা না করে। একইসাথে তার নানির কন্ঠেও এই কথাগুলি রেকর্ড করে বাজানো হয় জঙ্গলজুড়ে।
এভাবেই অবশেষে জঙ্গলে বসবাসকারী আদিবাসী ও সেনাবাহিনীর মিলিত চেষ্টায় উদ্ধার করা হয় শিশুদের।
সহোদর শিশুদের টিকে থাকার কথা
উদ্ধারকৃত শিশুরা ছিল কলোম্বিয়ার হুইতুতু সম্প্রদায়ের। এই সম্প্রদায়ের আছে জঙ্গলে মানিয়ে চলার দক্ষতা। পরিবার থেকে শেখা বিভিন্ন ফলমূল ও শেকড় শনাক্ত করে জঙ্গলে টিকে থাকার কৌশলই তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। এছাড়া বিমানের ধ্বংসাবশেষ থেকে দরকারি জিনিসও সংগ্রহ করেছে তারা।
বাচ্চাদের নানি ফাতিমা ভ্যালেন্সিয়া জানান, এই চার ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় লেসলি মুকুতির বয়স ১৩ বছর, সে আগে থেকেই তার মা কাজে গেলে বাকি তিন ভাইবোনের দেখাশোনা করতো। সেই তার ভাইবোনদের আটা এবং ক্যাসাভা রুটি খাইয়েছে, ঝোপঝাড় থেকে ফল সংগ্রহ করেছে।
লেসলির প্রশংসা করে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইভান ভেলাসকুয়েজ বলেন, “তাকে (লেসলি) ধন্যবাদ, তার নেতৃত্বগুণ, জঙ্গল সম্পর্কে জ্ঞান ও তার যত্ন বাকি তিনজনকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।”

মায়ের শেষ কথা
শিশুরা জানায়, গভীর আমাজন এলাকা থেকে উড়ে যাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পাইলট ইঞ্জিনে সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন। এরপর দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে শিশুদের মা চার দিন জীবিত ছিলেন।
মারা যাওয়ার আগে তিনি শিশুদের বলেন, ‘তোমরা এখান থেকে চলে যাও। তোমরা দেখতে পাবে তোমাদের বাবা কেমন মানুষ এবং তিনিও তোমাদের একইভাবে ভালোবাসবেন যেভাবে আমি বেসেছি।’
শিশুদের মা ম্যাগডালেনা ছিলেন একজন আদিবাসী নেত্রী।
কলম্বিয়ার ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অ্যাসট্রিড ক্যাসেরেস জানিয়েছেন, বাচ্চারা এখনো সেভাবে কথা বলছে না এবং তাদের পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।








