ভারতের কলকাতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যালয় স্থাপনের খবরে নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। জুলাই গণহত্যার দায়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা একটি দলকে কীভাবে প্রতিবেশী একটি দেশ অফিস স্থাপন করে কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দিচ্ছে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন রাজনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ চ্যানেল আইকে বলেছেন, ভারতে আওয়ামী লীগকে অফিস স্থাপন করতে দেওয়ার খবর আমরা শুনেছি। এটি কোনভাবেই প্রত্যাশিত নয়। কার্যালয় স্থাপনের খবর যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের সরকারকে অবশ্যই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ, এটা করার অবশ্যই কোন অসৎ উদ্দেশ্য আছে।
তিনি বলেন, এখানে সরকারের নীরব থাকার কোন উপায় নেই। আমরা দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ চাই। রক্তের মধ্যদিয়ে আমরা যে বাংলাদেশ পেয়েছি, সেটি সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাই। এজন্য জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

চ্যানেল আইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, কলকাতায় রাজনৈতিক কার্যালয় খোলা এবং বাংলাদেশে তাদের যেসব কর্মকাণ্ড হচ্ছে, এর সাথে যে কোন যোগসূত্র নেই তা বলা যাচ্ছে না। মাস্টারমাইন্ড হয়ে শেখ হাসিনা সেখান থেকে বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড শুরু করেছেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু চ্যানেল আইকে জানান, কলকাতায় আওয়ামী লীগের অফিস স্থাপনের সংবাদ আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি। এছাড়াও ভারতে তাদের কার্যক্রম চালানোর তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি। আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ এটা করবেই। তবে আওয়ামী লীগ যে দুঃশাসন ও গণহত্যা চালিয়েছে, তাতে তাদের বিচারের মুখোমুখি হয়ে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে তারা আবার জনগণের কাছে যেতে পারে। আওয়ামী লীগ নিজেদেরকে বাঁচাতে চাইলে, তাদের মতাদর্শ জনগণের কাছে আবারও নিতে চাইলে বিচার ও ক্ষমা প্রার্থনার মধ্যদিয়ে তাদেরকে যেতে হবে। নাহলে তারা পৃথিবীর যে দেশেই কার্যালয় করুক না কেন, আওয়ামী লীগকে পরগাছা এবং সন্ত্রাসবাদী দলের মতোই থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার আশঙ্কা, আওয়ামী লীগ কলকাতায় বসে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। তবে যারা গণহত্যায় মানুষের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়, তাদের এসব কর্মকাণ্ড কাজ করবে না। আওয়ামী লীগের লোকজনদের সংঘবদ্ধ রাখার জন্য তারা এটা করতে পারে, তবে আমার মনে হয় এটা তাদের জন্য আরও ক্ষতিকর হবে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে আমাদের যে ইউনিটি ছিল, সেটি আরও বাড়বে।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এই জায়গাটা সবসময়ই ক্ষত আকারে থাকবে। ভারত যত দ্রুত তাদের এই ভুল বুঝতে পারবে, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। আমরা তো চাই না ভারত কোন একটি চিহ্নিত অপরাধী চক্রকে আশ্রয় দিক। এটা যতদিন ভারত দিবে, ততদিন ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের জনমত থাকবে।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (পার্থ) সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস মাতাব্বর চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, উলফা’সহ ভারতের নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোকে বাংলাদেশ কখনোই কার্যক্রম চালতে দেয় না। আমরাও চাই প্রতিবেশীর বিচ্ছিন্নতাবাদী কোন সংগঠনকে বাংলাদেশে আশ্রয় না দেওয়া হোক।

‘কিন্তু ভারতেরও উচিৎ একই পলিসি অনুসরণ করা। ভারতকে মনে রাখতে হবে, আমরা ছোট প্রতিবেশী হতে পারি কিন্তু তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। এখন আমরাও যদি ভারতের পলিসি অনুসরণ করি সেটা বাংলাদেশ কিংবা ভারত কারও জন্যই সুখকর হবে না। সেজন্য সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোন দলকে ভারতে কার্যালয় খুলে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া যাবে না’, বলেন বিজেপির এই নেতা।

গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ বলেন, আওয়ামী লীগ কলকাতায় তাদের দলীয় কার্যালয় করেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। আমরা একটা বিষয় স্পষ্ট বলতে চাই, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ গণহত্যা চালিয়েছিল। আওয়ামী লীগকে এই দেশের মানুষ বাংলাদেশ থেকে বিতারিত করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আর আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে পারবে না, তারা চাইলে ভারতে রাজনীতি করতে পারে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দল ছিল না, এটা ভারতের একটা রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে সবসময় ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করেছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি’র যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেন, ভারত সবসময় দাবি করে তারা আমাদের বন্ধু। এমন একটি প্রতিবেশী দেশ কীভাবে বাংলাদেশের এতগুলো ক্রিমিনালকে আশ্রয় দিতে পারে? আওয়ামী লীগের মতো দলের কার্যালয় সেখানে খুলতে দেওয়া উদ্বেগজনক। ভারতে পলিটিক্যাল অফিস খোলা এবং বাংলাদেশে তাদের কালচারাল ফোর্স অ্যাক্টিভ হওয়া একইসূত্রে গাঁথা। ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল রাজনৈতিক দল, মত ও পক্ষকে এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। একইসাথে সরকারকে এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
উল্লেখ্য, কলকাতায় একটি বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সে আওয়ামী লীগ একটি অফিস খুলেছে এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়ার পরের কয়েক মাসে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা ভারতে অবস্থান করছেন, তারা ওই অফিসে যাতায়াত করছে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।








