বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম জঙ্গি হামলার ঘটনাটি ঘটেছিলো ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ওই জঙ্গি হামলায় ১৭ জন বিদেশিসহ ২২ জন নিহত হয়েছিল।
এরপর জঙ্গি নির্মূলে সর্বোচ্চ কঠোর হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যদিও দু’বছর আগেও আলাদত থেকে জঙ্গিরা পালিয়ে যায়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, শতভাগ না হলেও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে জঙ্গিবাদ।
২০১৬ সালের পহেলা জুলাই, গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারি দখল করে মুহুর্মুহু গুলি করে জঙ্গিরা। হামলায় নিহত হন ২২ জন। এদের মধ্যে ১৭ জন বিদেশি ও দুজন পুলিশ সদস্যও ছিলেন। অন্তত ৩০-৩৫ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আহত হন চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১১টা ২০ মিনিটে বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাহউদ্দিন খান মৃত্যুবরণ করেন। এর কিছুক্ষণ পরই ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) মো. রবিউল করিমের মৃত্যু হয়।
হোলি আর্টিজন হামলার পর কঠোর অবস্থানে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২০১৬ এর পর দেশে আর কোনো জঙ্গি হামলা হয়নি। পরের আট বছরে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয় কয়েকশ জঙ্গি।
গুলশান হামলার পর জঙ্গি দমন অভিযান গতি পায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে অনেক জঙ্গি গ্রেপ্তার হওয়ার পাশাপাশি শীর্ষনেতাদের প্রায় সবাই মারা যান।
এরই মধ্যে, ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর দিন দুপুরে আদালত পাড়া থেকে দুই জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্য স্বীকার করছে, দেশের জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।
ওই ঘটনার মাত্র চার মাস আগে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ দমনে গঠন করা হয়েছিলো ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর আলোচিত এ মামলার রায় দেওয়া হয়। হামলায় জড়িত থাকার জন্য আট জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। খালাস পান একজন।
গত বছরের অক্টোবরে হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত জঙ্গির সাজা পাল্টে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন হাই কোর্ট। সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন।
এদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন জানান, সাত জঙ্গির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায়ের কপি হাতে পেলে প্রয়োজনে আপিল করবে তারা। তিনি বলেন, এখনও পুরো রায় আমরা পাইনি। জাজমেন্ট হাতে পেলে তারপর কী করবো সে সিদ্ধান্ত নেবো।
হোলি আর্টিজান হামলায় জড়িতরা যারা পরে অভিযানে নিহত
অভিযান পরিচালনাকালে নিহত হয় জড়িত ৮ জন জঙ্গি। তারা হলেন- তামিম আহমেদ চৌধুরী (৩৩), রুল ইসলাম মারজান (২৩), সারোয়ার জাহান মানিক (৩৫), তানভীর কাদেরী (৪০), বাশারুজ্জামান চকলেট (৩২), মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম (৩৭), মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান (৩২) এবং রায়হানুল কবির রায়হান ওরফে তারেক (২০)।
সিটিটিসির অভিযান
হোলি আর্টিজানের পরে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) মোট ৮২৬ জন জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে- জেএমবির ২০০ জন, নিউ জেএমবির ১৮০ জন, আনসাল আল ইসলামের ২৩০ জন, হরকাতুল জিহাদের ১৫ জন, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ১৮ জন, নতুন জঙ্গি সংগঠন ইমাম মাহমুদের কাফেলার ৪১ জন এবং সংগঠন উল্লেখ নেই এমন ২২ জনকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি।
র্যাবের অভিযান
হলি আর্টিসানের পর র্যাব ১ হাজার ৮৭৫ জঙ্গি সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে ৮৭৩ জন জেএমবি সদস্য, হরকাতুল জিহাদের (হুজিবি) ৩৭ জন, হিযবুত তাহরীরের ১০৪, আনসার আল ইসলামের ৪৭৩ সদস্য, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ৮২ সদস্য এবং অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের ৩০৬ জনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
২০১৬ সালের ২ জুলাই ভোর ৭টা ৩৫ মিনিটে গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয় যৌথ কমান্ডো দল। ৭টা ৪৫ মিনিটে কমান্ডো বাহিনী ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ অভিযান শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দলের সদস্যরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করে। এসময় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। সকাল সোয়া ৮টায় রেস্টুরেন্ট থেকে প্রথম দফায় নারী ও শিশুসহ ৬ জনকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। পাশের একটি ভবন থেকে একজন বিদেশী নাগরিক তার মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন। ৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভিযানকারীরা। গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতর বিস্ফোরকের জন্য তল্লাশি শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে গোয়েন্দারা। ৯টা ১৫ মিনিটে অভিযান শেষ হয়। কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান হয়।
হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় নিহত হন ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৭ নাগরিক। প্রতি বছর ১ জুলাই নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিদেশি কূটনীতিকরা। সে ধারাবাহিকতায় আজ সোমবার এক শোকসভার আয়োজন করেছে ঢাকার ইতালি দূতাবাস।







