হাঙ্গেরির সাধারণ মানুষ ব্যালট বাক্সে এক নতুন ‘ইতিহাস রচনা’ করেছেন। ইউরোপের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ঐতিহাসিক নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের দীর্ঘ একচ্ছত্র শাসনের অবসান ঘটেছে। নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেছে বিরোধী নেতা পিটার ম্যগিয়ারের নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থী দল ‘টিসা’।
রোববার (১২ এপ্রিল ) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছেন। ভোটদানের হার ছিল প্রায় ৭৮ শতাংশ, যা হাঙ্গেরির সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে একটি নতুন রেকর্ড। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ১৯৯ আসনের পার্লামেন্টে টিসা পার্টি ১৩৮টি আসনে জয়লাভ করার পথে রয়েছে, যা এককভাবে সরকার গঠন এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার (সুপার-মজরিটি) চেয়েও বেশি। অন্যদিকে অরবানের ক্ষমতাসীন দল ‘ফিদেস’ মাত্র ৫৪টি আসনে আটকে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরাজয় সুনিশ্চিত হওয়ার পর, ৬২ বছর বয়সী ভিক্টর অরবান তাঁর নির্বাচনী সদর দপ্তরে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে পরাজয় স্বীকার করে নেন। এই ফলাফলকে একটি “বেদনাদায়ক” অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “নির্বাচনী ফলাফল স্পষ্ট। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব এবার আমাদের হাতে নেই।” পরবর্তীতে বিরোধী নেতা পিটার ম্যগিয়ার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে, বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী অরবান তাঁকে ফোন করে জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন।
৪৫ বছর বয়সী পিটার ম্যগিয়ার একসময় অরবানের ফিদেস দলেরই অভিজাত সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালে তিনি দলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। টিসা দলের দায়িত্ব নিয়ে তিনি দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচারণা চালান এবং এটিকে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেন। তাঁর প্রচারণার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের দুর্বল অর্থনীতি, ভঙ্গুর রেল ব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং হাসপাতালের বেহাল দশা দূর করা।
ভোট দেওয়ার পর ম্যগিয়ার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “হাঙ্গেরির মানুষ আজ ইতিহাস লিখছে। এটি পূর্ব নাকি পশ্চিম, অপপ্রচার নাকি সৎ জনমত, দুর্নীতি নাকি পরিচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থা—এসবের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার নির্বাচন।”
ভিক্টর অরবানের এই পরাজয় বৈশ্বিক কট্টর ডানপন্থী রাজনীতি এবং ‘মাগা’ আন্দোলনের জন্য একটি বড় আদর্শিক ধাক্কা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এমনকি নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স বুদাপেস্টে গিয়ে অরবানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন।
অরবান ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদী নেতা ছিলেন (২০১০ থেকে ক্ষমতায়), যিনি প্রায়শই ইইউ-এর বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ভেটো দিতেন। বিশেষ করে ইউক্রেনকে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর প্রবল বিরোধিতা এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল। তাঁর পতনে ব্রাসেলসের মূলধারার ইইউ নেতারা স্বস্তি প্রকাশ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন কেবল হাঙ্গেরির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং সমগ্র ইউরোপ এবং বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একটি পরিচ্ছন্ন, দুর্নীতিমুক্ত ও ইউরোপপন্থী হাঙ্গেরি গড়ার যে প্রতিশ্রুতি ম্যগিয়ার দিয়েছেন, আগামী দিনগুলোতে তার বাস্তবায়নই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।







