হজ ব্যবস্থাপনায় উৎকর্ষ ও অগ্রগতি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ২০২৬ সালে এক অনন্য হজ ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। এ বছর সৌদি আরব ও বাংলাদেশ উভয় ক্ষেত্রেই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় হজ আরও সুবিন্যস্ত ও সাবলিল হয়েছে। ফলে হাজিদের জন্য হজ পালনও সহজ হয়ে উঠেছে।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১ জুলাই বাংলাদেশি হাজিদের সর্বশেষ ফ্লাইট এর মাধ্যমে শেষ হবে ফিরতি হজ ফ্লাইট। গতকাল পর্যন্ত হজ বাংলাদেশের ৭৮ হাজার ৫০০ হজযাত্রীর মধ্যে প্রায় ৬৫ হাজার হাজি দেশে পৌঁছেছেন। এত বিপুল সংখ্যক হজযাত্রী সৌদি আরবে এসে পৌঁছানো এবং ফিরে যাবার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত কোন দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। হজ পালন করতে এসে আজ পর্যন্ত ৫৪ জন হাজি বিভিন্ন কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন।
হজ পালন একটি কঠিন ইবাদত, একসাথে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আগত প্রায় ১৭ থেকে ২০ লাখ হজ যাত্রীকে আবাসন যাতায়াত খাবার ব্যবস্থাপনা একটি বহুমাত্রিক, জটিল ও শ্রমসাধ্য কাজ। যথাযথ কর্মপরিকল্পনা ও এর সফল বাস্তবায়ন ব্যতীত এ কাজে সফলতা লাভ করা সম্ভব নয়।

বিগত কয়েক বছর যাবত হজ ব্যবস্থাপনায় সৌদি সরকার আমূল পরিবর্তন এনেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের হজে সৌদি সরকারের তথ্য অনুযায়ী ১ হাজার ৩০১ জন হাজি মারা গিয়েছিলেন যাদের বেশির ভাগই চরম গরমে হিটস্ট্রোক আর ডিহাইড্রেশনে মারা গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এ কারণে গত বছর থেকেই হজ ব্যবস্থাপনায় কঠোর অবস্থান নেন সৌদি সরকার। অত্যাধিক সূর্যতাপে নিয়ন্ত্রণ করেন জামারায় পাথর নিক্ষেপ এর সময়সীমা।
বাড়তি মানুষের অহেতুক ভিড় এড়িয়ে হজের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতে অনুমতি ছাড়া মক্কা ও হজ সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। সৌদি সরকার হজের মৌসুম প্রায় ৪ লাখের মতো নিবন্ধিতদের মক্কা থেকে সরিয়ে নিয়েছেন।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে ট্রান্সপোর্টেশন আইনের যথাযথ প্রয়োগের কারণে যানজট মুক্ত এবং কোন প্রকার দুর্ঘটনার খবর না থাকায় বিগত ৪০ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে সেরা হজ এবং ২৬ সালের হজকে আরো একধাপ এগিয়ে এক্সিডেন্ট ফ্রি হজ হিসাবে ঘোষণা করে দেশটি।
সৌদি সরকারের স্বাচ্ছন্দে হজ ব্যবস্থাপনা প্রতিপালনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করায় কিছুটা বিপাকে পড়ে হজের সাথে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো, বিশেষ করে যেসব দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক হাজি এসে থাকেন তাদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ।
সৌদি হজ ও ওমরা মন্ত্রণালয় স্থানীয় প্রশাসন এর নতুন নতুন ও কঠিন নীতিমালার কারণে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায়ও প্রতিবছরের মত এবছরও ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন সরকারের অধীনে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ধর্মমন্ত্রী, নবনিযুক্ত কাউন্সিলর এবং কনসাল (হজ) দায়িত্ব নেন হজের। বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল স্টেক হোল্ডারদের সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠক করেন। নিবন্ধিত সকল হাজী যেন পবিত্র হজ পালনে মক্কায় যেতে পারেন এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বার্তা দেন ধর্মমন্ত্রী কাজি শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারী ও বেসরকারি হজ এজেন্সি মালিক প্রতিনিধিদের হজ পালন করতে গিয়ে কোন হাজী যেন কষ্ট না পায় এই বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন।
এ বছরের হজে বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় ধর্ম মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ঢাকা হজ ক্যাম্পে সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি নিজে অমানবিক পরিশ্রম করে হাজীদের সেবা দিয়েছেন। কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন তিনি কোন ভিআইপি নন তিনি সত্যিকারের হাজিদের সেবক। তার নেতৃত্বে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সকল কর্মকর্তা কর্মচারীরাও একযোগে কাজ করেছেন হাজিদের সেবায়।
এই বছর প্রথমবারের কোন ধর্মমন্ত্রীকে দেখা যায় সরকারি অর্থের পাশাপাশি নিজের পকেটের টাকা ব্যয় করেছেন হাজিদের কল্যাণে। তাছাড়া হজ মিশনকে কোন সরকারি টাকা ব্যয় করতে দেননি তিনি। এ প্রসংগে মক্কায় হজের সাথে সংশ্লিষ্টরা ধর্ম মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ এর নেতৃত্বে মক্কায় বাংলাদেশ হজমিশন ব্যতিক্রমধর্মী হজ ব্যবস্থাপনার জন্য নিরলস কাজ করেছেন।
অন্যান্য মন্ত্রীদের প্রটোকল দিতে সরকারি কর্মকর্তাদের যেখানে হিমশিম খেতে হয় সেখানে তিনি বিন্দুমাত্র প্রটোকল দেয়ার সু্যোগ দেননি। হজ মিশনের উদ্যোগে মন্ত্রীর থাকার ব্যবস্থা ধাকলেও তিনি নিজের টাকায় থেকেছেন মক্কা ও মদিনার হোটেলে। হজ মিশনে কোন সভায় বা পরিদর্শনে গেলে নিজের খরচে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিসহ সকলকে আপ্যায়ন করেছেন তিনি। হজের কাজে যাতায়াতের জন্য সরকারি গাড়ির পরিবর্তে ব্যবহার করেছেন তার নিজের খরচে ভাড়া করা গাড়ি ও ড্রাইভার।
অথচ বিগত সময়ে হজে ভিআইপিদের আগমন হলে, সেখানে থাকতেন দেশের ক্ষমতাধর মন্ত্রী, এমপি ও সচিব ও আমলারা। হজ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিগন তাদের প্রটোকল ও নানা নির্দেশ পালনে ব্যস্ত থাকতেন।
ধর্মমন্ত্রী কখনো মক্কায়, কখনো মদিনায় আবার জেদ্দা এয়ারপোর্টে অবস্থান করে হজ্জ ব্যবস্থাপনার তদারকি করেছেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদেরও দেখা গেছে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে। মন্ত্রীর এ পথ অনুসরন করে হজ কাউন্সেলর মো. কামরুল ইসলামের সাথে দলবেধে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আগত সকল কর্মকর্তা কর্মচারি একসাথে কাজ করেছেন হারানো লাগেজ উদ্ধারে, মিনায় পথহারা হাজিকে পথ দেখাতে।
রিয়াদ বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, জেদ্দা বাংলাদেশ কনস্যুলেটর কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন এর নেতৃত্বে দূতাবাসও কনসুলেটের কর্মকর্তাদের হাজিদের সেবায় তৎপরতা ছিল লক্ষণীয়। বাংলাদেশের বেসরকারি হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন এর মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদারের নেতৃত্বে সংগঠনটির কার্যকরী কমিটির সদস্যদের হজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠ হজ্জ ব্যবস্থাপনায় কাজ করেছেন নিরলস ভাবে।
হাজিদের সেবাদানের জন্য প্রতিবছরের মত এ বছর ও মক্কা মদিনা ও জেদ্দায় নিয়োজিত ছিলেন ৪০০ হজ কর্মী। ব্যতিক্রম হলো এবারে হজকর্মীগনও হজ সেবাকর্ম পালন করতে পেরেছেন। অন্য হজ মৌসুমে যেখানে ভিআইপিদের জন্য ২ থেকে ৪ জন হজ কর্মী পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। সেখানে মিশনের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বদা ভিআইপিদের দেখভাল করার জন্য অনেকটা সময় ব্যয় করতে হতো যার কারণে হাজিদের খোঁজখবর তেমন একটা নিতে পারতেন না এসব কর্মকর্তারা।
কিন্তু ২৪/২৫ সালের হজ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব রীতিনীতি কমে আসতে শুরু করেছে। এবছর যা ছিল শূন্যের কোটায়। এমনকি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও নিজের প্রয়োজনে কোন হজ কর্মীকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেননি।
হজ প্রতিপালন বিষয়ে প্রতিনিধির সাথে আলাপকালে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ এ বছরের হজকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করার কথা জানান। প্রথমে বাংলাদেশ হজ এজেন্সিজ এসোসিয়েশন (হাব)এর নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন বেসরকারি এজেন্সি ও লীড এজেন্সীর প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বার্তা পৌঁছে দেন।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ অনু বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের যার যার দায়িত্ব সম্পর্কে সতর্ক করেন। হজ ব্যবস্থাপনায় কারো গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না এবং হাজীরা কষ্ট করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে জানান। তিনি হজ গাইডের ভাল সেবা প্রদানের জন্য ব্যক্তিগতভাবে মোট পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার হিসেবে ঘোষনা করেন যা হজের মত দলগত ইবাদতে হজ গাইডদের মাঝে আরো শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত করে। এর ফল সার্বিক হজ ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত চমৎকার ও ইতিবাচক হিসেবে প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনার একটি সম্মিলিত সাফল্যের চিত্র ফুটে ওঠে।







