‘আহ্ মাটির কাপে চা; তৃপ্তিটাই আলাদা। পর পর দুইটা খাইলাম। আবার আসিব বন্ধু, আবার খাইবো চা সবাইকে তা জানাইলাম।’ ‘গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালা’ দোকানে চা পান করে এমনি অনুভুতি প্রকাশ করলেন দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র রাহেল ইসলাম সোহাগ। শুধু তিনি নন, সঙ্গে ৫ বন্ধু এক সাথে চা পান করতে এসেছেন গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালা’র দোকানে।
দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ ময়দানে নানা বয়সী মানুষের ভীড় এই দোকানে চা পানে।
গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালাখ্যাত এই দোকান পরিচালনা করছেন দিনাজপুরের একটি বেসরকারি পলিটেকনিক কলেজের সিভিল বিভাগের তিন শিক্ষার্থী।তারা হলেন—সুরুজ্জামান ইসলাম সুজন, সাইফুল ইসলাম ও মোজাহিদুল ইসলাম রানা।
বড় ময়দানের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অদূরেই তাদের ভাসমান চায়ের দোকান। কোনো কাজই ছোট নয়—এমন চিন্তা থেকে এই চায়ের দোকান খুলে বসেছেন তিন শিক্ষার্থী। দোকানের নাম দিয়েছেন ‘গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালা।’

কীভাবে এর শুরু, জানালেন তারা। সুজন শেষ সেমিস্টার, সাইফুল ও রানা পড়ছেন ৭ম সেমিস্টারে। তাদের বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায়। একই কলেজে পড়াশোনা ও বাড়ি একই এলাকায় হওয়ায় তারা কিছু একটা করার চিন্তা করেন। সেই চিন্তা থেকেই ২০২০ সালে ইউটিউবে ভারতে ও চীনে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানের ভিডিও দেখে চা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। তবে আর্থিক ও পরিবারের সমর্থন না থাকায় শুরু করতে পারেননি। পরে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে টাকা জমিয়ে তারা শুরু করেন ভাসমান চায়ের দোকান।
প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কাপ চা বিক্রি হয় দোকানটিতে। এখানে ভিন্ন দামের ৫ রকমের চা পাওয়া যায় পোড়ামাটি ও প্লাস্টিকের কাপে। পোড়ামাটির প্রতি কাপ চা ২০ টাকা আর প্লাস্টিকের প্রতি কাপ চা ১৫ টাকা। প্রতিমাসে এখন তাদের গড় আয় দেড় লাখ টাকা। দিতে হয় না দোকান ভাড়া, নেই কোনো ঝুট-ঝামেলা। নির্দ্বিধায় দোকান চালায় তারা।
তারা জানিয়েছেন, চা দোকান শুরুর উদ্যোগটা সহজ ছিল না। পরিবারকে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সমাজের লোকজনের নানা কথা শুনতে হয়েছে তাদের। তবে এখন অনেকে সাধুবাদ দিচ্ছেন। যেখানে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে চায়ের চুমুকে সময় পার করতে আসেন অনেকে।
গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালার চায়ের স্বাদ যেমন অনন্য, তেমনি বাহারি চায়ের ভাঁড়। এই দুইয়ের আকর্ষণে দোকানে ভীড় জমাচ্ছেন চাপ্রেমীরা। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে চায়ের দোকান। ভিন্ন উদ্যোগ ও স্বাদের টানে শহরজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তিন শিক্ষার্থীর গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালা।
দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রত্মা রায় বলেন, ‘আমরা বন্ধুরা মিলে আজ এসেছি গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালা ভাইদের চা খেতে। এখানে চা খাওয়ার অনুভূতিটা অন্যরকম। চায়ের স্বাদ অসাধারণ। পরবর্তীতে আমরা এখানে আবার আসব চা খেতে।’
জেলা পরিষদের সদস্য মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমি দিনাজপুরের মানুষ হয়ে তাদের প্রশংসা করি। তারা তিনজন তরুণ সমাজকে একটা মেসেজ দিতে পেরেছে যে কোনো কাজই ছোট নয়। তাদের চায়ের স্বাদ খুব ভালো। তাদের তিনজনের জন্য শুভ কামনা।’
গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালার প্রধান উদ্যোক্তা সুরুত জামান ইসলাম সুজন বলেন, এই চায়ের দোকান দিয়ে প্রথমে পরিবারের সঙ্গে এক প্রকার যুদ্ধ করতে হয়েছিল। পরে অবশ্য পরিবারকে রাজি করা গেছে। এছাড়াও পরিকল্পনা অনেক আগে করলেও আর্থিক সমস্যার কারণে শুরু করা যায়নি। পরবর্তীতে ফাইবারসহ বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে কাজ করে ৮০ হাজার টাকার মূলধন দিয়ে দুই মাসে গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালার পথচলা শুরু হয়। আমরা প্রথমে সাড়া না পেলেও বর্তমানে প্রচুর চাহিদা আমাদের চায়ের। শুরুর দিকে দোকানে ২০ লিটারের মতো দুধ লাগলেও এখন প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ লিটারের মতো দুধ লাগছে। সবাই চায়ের প্রশংসা করছে। ভবিষ্যতে দেশে ও দেশের বাহিরে দোকান দেওয়ার চিন্তা ভাবনা রয়েছে।
প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে এ চায়ের দোকান। ভিন্ন উদ্যোগ ও স্বাদের টানে শহরে এই চায়ের দোকানের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ছাড়াও চা পান করতে আসছেন গৃহিণী, শিক্ষক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। এখানে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫০০ কাপ চা বিক্রি হয়। শুক্রবার বা সরকারি ছুটির দিনে ৬০০ কাপ পর্যন্ত চা বিক্রি হয়ে থাকে।








