ভারতীয় উপমহাদেশের নারীদেরর কাছে স্বর্ণ কেবল অলঙ্কার নয়, এযেন এক নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে চলা নিরাপত্তার সোনালি বন্ধন। বিশেষত ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ঘরে ঘরে মেয়েদের জীবনজুড়ে স্বর্ণ এক অনিবার্য সঙ্গী—জন্মের মুহূর্তে প্রথম উপহার, শিশুকালে মায়ের কোলে বসে কানে পরা ছোট্ট বালা, কৈশোরে উৎসবের দিনে পাওয়া চেইন, আর প্রাপ্তবয়সে বিয়ের মুহূর্তে জমে ওঠা গয়নার ভার।
প্রতিটি টুকরো স্বর্ণ যেন জীবনের একেকটি অধ্যায়ের নিঃশব্দ স্মারক। একদিকে শোভা, অন্যদিকে সঞ্চয়। স্বর্ণালঙ্কারের এই সংগ্রহ কোনো হঠাৎ কেনা বিলাস নয়, বরং সময়ের সাথে গড়ে ওঠা এক নীরব প্রস্তুতি, যা জীবনের অজানা অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে হয়ে ওঠে নির্ভরতার প্রতীক। উপহার, উত্তরাধিকার আর উৎসবের স্মৃতিতে গাঁথা সেই সংগ্রহ বিয়ের সময় গিয়ে পূর্ণতা পায়।

পাকিস্তানের ফারজানা ঘানি মেয়ের বিয়ের সময় একে একে খুলে ফেললেন তার সযত্নে সঞ্চিত সেই সব স্বর্ণালঙ্কার, যেগুলো বহু বছর ধরে জমিয়ে রেখেছিলেন তিনি। প্রতিটি টুকরো স্বর্ণ তার জীবনের একেকটি অধ্যায়ের সাক্ষী—মায়ের কাছ থেকে হজ্ব শেষে পাওয়া একটি স্বর্ণের চেইন, শ্বাশুড়ির দেওয়া বিবাহের গয়নার সেট, কিংবা মেয়ের জন্ম উপলক্ষে উপহার হিসেবে পাওয়া স্বর্ণমুদ্রা।
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে বসবাসকারী ৫৬ বছর বয়সী ঘানি বলেন, বন্ড আর নগদের তুলনায় আমি এখনও স্বর্ণমুদ্রাই কিনতে পছন্দ করি।
সংস্কৃতির অংশ স্বর্ণালঙ্কার
স্বর্ণের প্রতি দক্ষিণ এশীয়দের ভালোবাসা কেবল রূপ বা অর্থের কারণে নয়। এটি তাদের সামাজিক, পারিবারিক ও আর্থিক সংস্কৃতির একটি গভীর অংশ। ভারতের গ্রাম হোক বা শহর, দরিদ্র হোক কিংবা ধনী—স্বর্ণ সব শ্রেণি-পেশার নারীদের জন্যই এক অবিচ্ছেদ্য উত্তরাধিকার। এমনকি অনেক নারী সোনার জরির কাজের শাড়ি উপহার পান যা প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক নারী এখনও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা আধুনিক বিনিয়োগ পদ্ধতির বাইরে। সেখানে স্বর্ণ হয়ে ওঠে অর্থ সঞ্চয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
স্বর্ণের দামে উল্লম্ফন, তবুও লাভবান এশীয় নারীরা
রোববার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সিএনএন জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে চলছে স্বর্ণের এক নতুন উন্মাদনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশৃঙ্খল বাণিজ্য নীতি ও ফেডারেল রিজার্ভের নেতার প্রতি তাঁর প্রকাশ্য আক্রমণের কারণে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়ে গেছে।
বিনিয়োগকারীরা কাগজের মুদ্রা থেকে সরে এসে ছুটছেন স্বর্ণের নিরাপদ আশ্রয়ে। এরই মধ্যে স্বর্ণের দাম প্রতি ট্রয় আউন্সে ৩ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে—যা ঐতিহাসিক রেকর্ড। এই বাজারে সবচেয়ে লাভবানদের মধ্যে রয়েছেন সেই দক্ষিণ এশীয় নারীরা, যারা বহু বছর ধরেই স্বর্ণে বিনিয়োগ করে আসছেন।
টিকটকে নিজের গয়নার সংগ্রহ প্রদর্শন করে একজন প্রবাসী দক্ষিণ এশীয় মা জানান, যখন আমি এই ২৪ ক্যারেটের হারটি কিনি, তখন সোনার দাম ছিল প্রতি গ্রাম ১২ ডলার। এখন সেটা ১০০ ডলার। আমার যা গহনা আছে, সবই স্বর্ণের।

ভারতের গয়নার বাজার: এক বিশাল অর্থনৈতিক বলয়
বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের তথ্য মতে, ২০২৩ সালে ভারত ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ গয়নার বাজার, যেখানে ৬১১ টন স্বর্ণ গয়না কেনা হয়। এর তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে কেনা হয় ২৪১ টন। আর এসব গয়নার অর্ধেকের বেশি ব্যবহার হয় কেবল বিয়েতে। দেশটিতে প্রতিবছর ১ কোটি ১০ লাখ থেকে ১ কোটি ৩০ লাখ বিয়ে হয়। তাই গয়না কেবল সাজসজ্জার অংশ নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে বিয়ের খরচের একটি মূল অনুষঙ্গ এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের একটি চালিকা শক্তি।
বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলের সিনিয়র মার্কেট স্ট্র্যাটেজিস্ট জোসেফ কাভাটোনি বলছেন, গয়না একদিকে ভোক্তাবান্ধব, অন্যদিকে এটি অর্থ সঞ্চয় ও প্রজন্মান্তরে সম্পদ হস্তান্তরের কার্যকর মাধ্যম।
রূপ বদলাচ্ছে, তবু জমছে ভালোবাসা
বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও দক্ষিণ এশীয়রা তাদের স্বর্ণ বিক্রি করছেন না, বরং অনেকেই পুরোনো গয়না নতুনভাবে রূপান্তর করছেন।এখন তরুণ প্রজন্ম গয়না চাইছে আধুনিক ছাঁচে—ব্যবহারযোগ্য, দৃষ্টিনন্দন, কিন্তু ঐতিহ্যের ছোঁয়াযুক্ত।
ফারজানা ঘানির মেয়ে যখন গত ডিসেম্বরে মায়ামিতে বিয়ে করেন, তখন ঘানি তার পুরোনো গয়না ও সঞ্চিত স্বর্ণমুদ্রা গলিয়ে তৈরি করেন একটি আধুনিক গয়নার সংগ্রহ—যা তার মেয়ে ভবিষ্যতে নিজের সন্তানদের দিতে পারবে।
ঘানি হেসে বলেন বলেন, সে চেয়েছিল আর্টিফিশিয়াল গয়না পরতে, কিন্তু আমি বলেছি, স্বর্ণই সবচেয়ে মার্জিত, সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ। অন্য কিছু না।
অলঙ্কার নয়, আর্থিক স্বাধীনতা
যেখানে পশ্চিমা দুনিয়া বিপদের সময়েই কেবল স্বর্ণে ভরসা রাখে, ভারতীয় উপমহাদেশের পরিবারগুলো স্বর্ণকে দেখছে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির অংশ হিসেবে—অর্থনৈতিক প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে যার মূল্যও বাড়ে।
ফারজানা ঘানি বলেন, আমরা আগের যুগের নারীরা সবসময় ‘দুর্দিনের জন্য কিছু জমিয়ে রাখো’ এই মন্ত্রে বিশ্বাস করি। আজকের জন্য নয়, কালকের কথাও ভাবতে হয় আমাদের।
স্বর্ণ, একদিকে ঐতিহ্য, অন্যদিকে আর্থিক আত্মনির্ভরতার প্রতীক হয়ে নারীদের জীবনে যুগ যুগ ধরে জ্বলতে থাকা এক ম্লানহীন প্রদীপ। আজকের বাজার সেই শতাব্দীপ্রাচীন আস্থাকেই যেন আরও একবার সোনা দিয়ে মুড়ে দিচ্ছে।







