বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চরম অস্থিরতা দেখা গেছে। গত এক বছরে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর শুক্রবার ও সোমবার হঠাৎ বড় ধরনের পতন ঘটে। তবে মঙ্গলবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও দাম এখনো সর্বোচ্চ অবস্থানের অনেক নিচে রয়েছে।
আজ (৩ ফেব্রুয়ারি) মঙ্গলবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আল জাজিরা জানিয়েছে, এই দামের ওঠানামার পেছনে একাধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করছে এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকটও রয়েছে।
কেন গত এক বছরে স্বর্ণ ও রুপার দাম এত বেড়েছে
স্বর্ণ ও রুপাকে সাধারণত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মুদ্রাস্ফীতির সময়ে বিনিয়োগকারীরা এসব মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকে পড়েন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। শুল্কনীতি, ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে চাপ এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো মন্তব্য বাজারে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে মার্কিন ডলার দুর্বল হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ ও রুপার দিকে ঝুঁকেছেন।
ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, আর রুপার দাম বেড়েছে প্রায় চার গুণ। একই সঙ্গে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বাড়তে থাকা সরকারি ঋণের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকটও স্বর্ণের চাহিদা বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ বর্তমানে প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এই প্রসঙ্গে প্লেনিসফার ইনভেস্টমেন্টসের পোর্টফোলিও কৌশল প্রধান ডিয়েগো ফ্রানজিন বলেন, স্বর্ণই একমাত্র সম্পদ যার কোনো প্রতিপক্ষ ঝুঁকি নেই এবং যা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয় এই কারণেই এটি নিরাপত্তা দেয়।
এছাড়া চীন ও তুরস্কসহ উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে স্বর্ণ কিনছে, যা দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স প্রায় ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে এবং রুপার দাম প্রায় ১২২ ডলারে পৌঁছে সর্বকালের রেকর্ড গড়ে।
হঠাৎ কেন ধস নামল
এই উল্লম্ফনের পর শুক্রবার স্বর্ণের দাম প্রায় ১০ শতাংশ এবং রুপার দাম প্রায় ২৮ শতাংশ কমে যায়। সোমবারও পতন অব্যাহত থাকে। মঙ্গলবার কিছুটা পুনরুদ্ধার দেখা গেলেও বাজার এখনো অস্থির।
কেউ কেউ মনে করছেন, ট্রাম্পই আবার এই পতনের কারণ। শুক্রবার তিনি ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান হিসেবে কেভিন ওয়ারশকে মনোনয়নের ঘোষণা দেন, যাকে তুলনামূলকভাবে প্রচলিত ও স্থিতিশীল পছন্দ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা কিছুটা কমে এবং নিরাপদ সম্পদ থেকে তারা সরে আসে। এছাড়া ইরানের সঙ্গে সমঝোতার আশাবাদও বাজারে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়, ফলে স্বর্ণ ও রুপার চাহিদা কমে যেতে পারে।তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, মূল কারণ ছিল অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি।
ব্যাংক জুলিয়াস বেয়ারের এশিয়া গবেষণা প্রধান মার্ক ম্যাথিউস বলেন, দাম ইতিমধ্যেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। মুনাফা তুলে নেওয়া শুরু হতেই পতন ত্বরান্বিত হয়।
সামনে কী হতে পারে
বাজারের ভবিষ্যৎ অনুমান করা কঠিন হলেও কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণ ও রুপার দাম আবার বাড়তে পারে। জেপি মরগানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৬ হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের দুর্বলতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ মজুত বাড়ানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকলে স্বর্ণ ও রুপা আবার বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রে ফিরে আসবে। তবে আগের মতো দ্রুত উল্লম্ফন নাও হতে পারে, যা বাজারের জন্য তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।








