২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দেশের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার নেতৃত্বে সেনাবাহিনী শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন করে, যা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়।
বর্তমানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি সংকটময় পরিস্থিতি থেকে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে অগ্রসর হয়েছে। তার দূরদর্শী নেতৃত্ব, গণতান্ত্রিক উত্তরণের পরিকল্পনা, সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার আহ্বান এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেশের জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। এই ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করেছে।
ওয়াকার উজ জামান বাংলাদেশের সেনাপ্রধান হিসেবে ৫ আগস্ট ও তার পরবর্তী সময়ে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের প্রসঙ্গে তার রাজনৈতিক অবস্থান অধিকাংশ সময় নিরপেক্ষ ও পেশাদারী, যা দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য ছিল।
সেনাপ্রধান হিসেবে তার প্রথম ভাষণে তিনি শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন এবং বলেন, দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি সামলাতে সেনাবাহিনী নামানো হয়। এ সময় তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হবে এবং সব হত্যার বিচার হবে। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং সহিংসতা বন্ধের জন্য অনুরোধ করেন।

এ সময় সেনাপ্রধান প্রতিশ্রুতি দেন যে, দেশের সব হত্যাকাণ্ড ও অন্যায়ের বিচার করা হবে। তিনি বলেন, আমরা সমস্ত দায়দায়িত্ব নিচ্ছি। আপনাদের কথা দিচ্ছি, আশাহত হবেন না। যত দাবি আছে, সেগুলো আমরা পূরণ করব। দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে নিয়ে আসব। যা দেশের মানুষের মাঝে বিশ্বাস এবং আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীতে, সেনাপ্রধান ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে জানান যে, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেবে এবং সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পূর্ণ সমর্থন প্রদান করবে।
জেনারেল ওয়াকার উজ জামান ২০২৪ সালের ২৩ জুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৮তম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেনাপ্রধান হিসেবে তার দায়িত্বগ্রহণের পরপরই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নতুন একটি পথচলার দিকে এগিয়ে যায়। আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর তিনি জোর দেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকেই তার কর্মতৎপরতা দৃশ্যমান হয় এবং সে সময় থেকেই তার পরিকল্পনা, বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দায়িত্বগ্রহণের পর জেনারেল ওয়াকার উজ জামান সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি নির্ভর প্রশিক্ষণের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, একটি যুগোপযোগী, পেশাদার ও চৌকস সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হবে। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় নতুন প্রযুক্তি যেমন সিমুলেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এবং সাইবার প্রতিরক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি সামরিক নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক শিক্ষা ও নৈতিকতা জোরদার করেন। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়াতে প্রযুক্তিনির্ভর বর্ডার সিকিউরিটি ব্যবস্থার দিকেও নজর দেন।

৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েই তিনি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের শান্তিরক্ষার ঐতিহ্যকে তিনি আরও সুসংগঠিত করার ঘোষণা দেন। তিনি জাতিসংঘের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে অংশ নিয়ে আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেন, যা ভবিষ্যতের শান্তিরক্ষীদের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
সেনাবাহিনীকেও তিনি “ডিজিটাল ফোর্স” হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তার উদ্যোগে সেনাবাহিনীর প্রতিটি ইউনিটে ইন্টারনেট কমিউনিকেশন চালু করা হয়, সাইবার নিরাপত্তা ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করা হয় এবং সেনা সদস্যদের জন্য অনলাইন প্রশিক্ষণ মডিউল চালু করা হয়। যা সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
তার বক্তব্যগুলোতে সবসময় জাতীয় স্বার্থ, নৈতিকতা ও শান্তির বার্তা স্পষ্ট থাকে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী শুধু যুদ্ধের জন্য নয়, বরং শান্তির জন্য প্রস্তুত থাকবে। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত। আমরা প্রযুক্তিনির্ভর, মানবিক ও দায়িত্বশীল বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠছি।
বর্ষা মৌসুমে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে সেনাবাহিনীকে দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে নিয়োজিত করা হয়। তিনি সরাসরি সেনানিবাস থেকে এই কার্যক্রম তদারকি করেন এবং সেনা সদস্যদের দক্ষ ও মানবিক সাড়া দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ জনমনে আস্থা সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার বিষয়ে তার স্পষ্ট অবস্থান। নভেম্বর ২০২৪-এ জাতীয় নিরাপত্তা সম্মেলনে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন আমাদের লক্ষ্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নয়। সংবিধান ও প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থেকেই আমরা কাজ করবো। তার এই বক্তব্য দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয় এবং সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার বার্তা দেয়।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি আধুনিক, মানবিক এবং চৌকষ বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠছে। তার নেতৃত্বে সেনাবাহিনী প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, শান্তিরক্ষা অংশগ্রহণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, এবং পেশাদারীত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষের কাছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হয়ে উঠেছে ভরসার কেন্দ্রস্থল।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







