ঘড়ির কাঁটা তখন রাত বারোটা ছুঁয়েছে। উত্তরজনপদে হিমেল হাওয়ায় ঠাকুরগাঁওয়ের পৈত্রিক বাসভবন তখন এক ঘরোয়া উদযাপনের সাক্ষী। সাদামাটা আয়োজনে ৭৯তম জন্মদিনের কেক কাটলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সোমবার ২৬ জানুয়ারি ৭৮ বছর পূর্ণ করে ৭৯তে পা দিলেন বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির এই ‘ক্লান্তিহীন’ কাণ্ডারি। জন্মদিন উদযাপনের এই সময়ে তার পাশে ছিলেন সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম এবং ছোট ভাই তথা জেলা বিএনপি সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিন।
বিগত কয়েক দশকের উত্তাল রাজনৈতিক জীবনে বারবার কারাবাস আর আইনি লড়াই যার নিত্যসঙ্গী, জন্মদিনেও তার চোখেমুখে ছিল লড়াইয়ের ছাপ। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী জানালেন, “পুরোদস্তুর ঘরোয়া মেজাজেই শ্রদ্ধেয় স্যারের জন্মদিন পালন করা হয়েছে। দিনভর রাজনৈতিক ব্যস্ততা আর মাঠের লড়াইয়ের ক্লান্তি থাকলেও, রাত সাড়ে ১২টা ৩০ মিনিট নাগাদ কেক কেটে মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখা হয়।”
১৯৪৮ সালের এই দিনেই ঠাকুরগাঁওয়ের সম্ভ্রান্ত মির্জা পরিবারে জন্ম তার। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন দাপুটে আইনজীবী ও সাবেক সংসদ সদস্য। রাজনীতির পাঠ পারিবারিক আবহেই নেওয়া। তবে মির্জা ফখরুলের যাত্রাটা শুরু হয়েছিল শিক্ষার আঙিনা থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির কৃতী ছাত্র ফখরুল সত্তরের দশকে বিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দেন শিক্ষা ক্যাডারে। ঢাকা কলেজসহ একাধিক সরকারি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন তিনি। এমনকি সরকারি নিরীক্ষক হিসেবেও তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
আশির দশকের শুরুতে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় শান দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ১৯৮৬ সালে রাজনীতির টান যেন সব কিছুকে ছাপিয়ে যায়। শিক্ষকতা ছেড়ে পাকাপাকিভাবে নামেন সক্রিয় রাজনীতিতে। ১৯৮৮-তে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া থেকে শুরু করে কৃষক দলের দায়িত্ব সামলে ধাপে ধাপে নিজেকে মেলে ধরেছেন তিনি। ১৯৯২ সালে জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব হাতে নেন। পরবর্তীকালে দু’বার সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
তবে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয় ২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর। প্রথমে ভারপ্রাপ্ত এবং পরে ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে দলের পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে একের পর এক রাজনৈতিক মামলায় বিদ্ধ হয়েছেন, জেল খেটেছেন একাধিকবার। তবুও পিছু হটেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের এক সময়ের এই লড়াকু নেতা।
পারিবারিক জীবনেও মির্জা ফখরুল যথেষ্ট স্থিতধী। তার দুই কন্যা মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ দুজনেই উচ্চশিক্ষিত। বড় মেয়ে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় গবেষণারত, ছোট জন যুক্ত শিক্ষকতায়। সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগমও উচ্চপদস্থ পেশাজীবী। তবে তিনি এখন পুরোদস্তুর গৃহিণী।
জন্মদিনের সকালে দেশজুড়ে অনুগামী ও নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়েছেন মহাসচিব। তবে জাঁকজমক থেকে বরাবরই দূরে থাকতে পছন্দ করেন অর্থনীতির এই প্রাক্তন অধ্যাপক। রাজনীতির দাবার ছক আর আন্দোলনের ময়দানে তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহল।








