তখন বাংলাদেশ টেলিভিশন ছিল সংস্কৃতি চর্চার পীঠস্থান। শিল্পী আর কলাকুশলীদের ভিড়ে গমগম করতো টেলিভিশন ভবন। প্রযোজকরা ব্যস্ত থাকতেন নিত্য নতুন অনুষ্ঠান নির্মাণ নিয়ে। দিনরাত কর্ম ব্যস্ততায় মুখর টেলিভিশন ভবন। ক্যামেরাম্যান, লাইটম্যান, সেট ডিজাইনারসহ অনুষ্ঠান নির্মাণে যারা নিয়োজিত তারা কাজ করে চলেছে বিভিন্ন স্টুডিওতে। পরিকল্পনা হচ্ছে। স্ক্রিপ্ট লেখা হচ্ছে। রিহার্সেল হচ্ছে আর জন্ম নিচ্ছে একেকটি অনুষ্ঠান। তখন বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রচণ্ড জনপ্রিয়।
বিটিভি’র নাটক মানেই দর্শকপ্রিয় তখন। এ ছাড়াও ছিল ছোটদের অনুষ্ঠান। বিদেশি সিরিয়াল। লাইভ অনুষ্ঠান, বাংলা-ইংরেজি খবর, নতুন কুঁড়িসহ নানা রকম অনুষ্ঠান। সবমিলিয়ে টেলিভিশনে বাংলাদেশ যেন ভেসে উঠতো। এই সময়টাতে ভালো ভালো গানও হয়েছিল বিটিভিতে।
মোস্তফা কামাল সৈয়দ একজন গান পাগল ব্যক্তি। তিনি পরিকল্পনা করলেন ভালো কিছু গান দরকার। স্বনামধন্য প্রযোজক নওয়াজিশ আলী খানকে দায়িত্ব দেয়া হলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি কিছু গান রেকর্ড করলেন। একটি গান লেখার দায়িত্ব দিলেন মনিরুজ্জামান মনিরকে। তিনি তখন তরুণ, পরবর্তীকালে বিখ্যাত গীতিকার। অনেক জনপ্রিয় গানের তিনি রচয়িতা। মনিরুজ্জামান মনির একদিন বিটিভিতে এলেন। নওয়াজিশ আলী খানের কাছে তিনি দুটি কাগজ চাইলেন। বললেন, দিন আজই লিখে দিচ্ছি।
নওয়াজিশ আলী খান বললেন, আমি একটু ঝামেলায় আছি- কাগজটি অন্যখান থেকে নিন।
মনিরুজ্জামান মনির তখন সিগারেটের প্যাকেট থেকে দুটো সিগারেট বের করে একটি নিজে ধরালেন আরেকটি দিলেন আলাউদ্দিন আলীকে। আলাউদ্দিন আলী মানে বিখ্যাত সুরকার আলাউদ্দিন আলী। মনিরুজ্জামান মনির খালি সিগারেটের প্যাকেটটি ছিঁড়ে ভেতরের রাংতার সাদা অংশে কলমের ছোঁয়া দিলেন। কলমের কালির অক্ষরে জীবন্ত হয়ে গেল ছেঁড়া সিগারেটের প্যাকেটের সেই ঝলমলে কাগজটি। গীতিকার মনিরুজ্জামান মনির গানটি লিখে ফেললেন আধা ঘণ্টার মধ্যে। এই কাগজেই লিখলেন প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ…..
আলাউদ্দিন আলীকে বললেন সুর করতে। আলাউদ্দিন আলী গানের সুর দিলেন। আলাউদ্দিন আলী নিজেও গানের কথা ভালো বুঝতে পারতেন। মনিরুজ্জামান মনির এবং আলাউদ্দিন আলী দু’জন মিলে ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গানটি তৈরি করলেন। এই গানটি আমাকে বিস্মিত করে। নতুন ধরনের কথা। আলাউদ্দিন আলী সুরও দিলেন নতুন ধরনের। সুরের ভেতরেই দেশাত্মবোধের চেতনা সুস্পষ্ট। গানটি শুনলেই এক ধরনের উদ্দীপনা তৈরি হয়। এই গানটি সবাই পছন্দ করলেন। গানটি একসময় প্রতিদিনই বিটিভিতে বাজতো। আলাউদ্দিন আলী ঠিক করলেন এই গানটিতে কণ্ঠ দেবেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। শিল্পীর কণ্ঠে গানটি তো প্রাণ পেলো। তিনি অসাধারণ গান করেন।
শাহনাজ রহমতউল্লাহর কণ্ঠে একটি দেশের গানের জন্ম হলো এবং দেশের মানুষ বুঝলো আমির আগে আমরা আর সবার আগে বাংলাদেশ।








