ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর চার বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে আক্রমণের নির্দেশ দেন। শুরুতে একে স্বল্পমেয়াদি অভিযান হিসেবে দেখা হলেও সময়ের সঙ্গে তা দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, আজ (২৪ ফেব্রুয়ারি) মঙ্গলবার যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করছে। যুদ্ধের দীর্ঘায়িত প্রভাব রাশিয়ায় স্পষ্ট। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ায় সামরিক ব্যয় বেড়ে বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে, কর বাড়ানো হয়েছে এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা চাপে পড়েছে, হতাহতের ছাপ বিভিন্ন অঞ্চলে দৃশ্যমান, আর জনমনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
সীমান্তের বাইরে, ভেতরেও যুদ্ধের ছাপ
মস্কো থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরের শহর ইয়েলেতস। শীতের সৌন্দর্যে মোড়া এক শান্ত জনপদ। কিন্তু শহরের প্রবেশমুখেই চোখে পড়ে সেনাবাহিনীতে যোগদানের আহ্বানসংবলিত বিশাল বিলবোর্ড। ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিলে এককালীন প্রায় ১৫ হাজার পাউন্ড সমপরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে সেখানে। পাশেই অস্ত্র তাক করা এক রুশ সেনার পোস্টার। ‘যেখানে থাকা প্রয়োজন, আমরা সেখানেই আছি’ স্লোগান।
শহরের একটি নয়তলা ভবনের দেয়ালে আঁকা পাঁচ রুশ সেনার মুখ। স্থানীয় এই পাঁচ বাসিন্দা ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। রুশ কর্তৃপক্ষ হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ না করলেও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি এখন আর অজানা নয়।
অর্থনীতিতে চাপ, বাড়ছে ব্যয়
যুদ্ধের দীর্ঘায়িত প্রভাব রাশিয়ার অর্থনীতিতে স্পষ্ট। বাজেট ঘাটতি বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি স্থবিরতার মুখে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ভ্যাট ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২২ শতাংশ করেছে। অতিরিক্ত রাজস্ব প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। ইয়েলেতসের বাসিন্দা ইরিনা বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম এমনভাবে বেড়েছে যে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চাপে। এক বেকারির মালিক আনাস্তাসিয়া বাইকোভা জানান, বিদ্যুৎ বিল, ভাড়া ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় পণ্যের মূল্য বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে ক্রেতা কমছে, লাভও কমছে।
লিপেতস্কে ক্ষোভ, নীরবতা
ইয়েলেতস থেকে এক ঘণ্টার পথ আঞ্চলিক রাজধানী লিপেতস্ক। এখানেও যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট। বাসিন্দা ইভান পাভলোভিচ বলেন, পেনশন বাড়লেও দ্রব্যমূল্য তার চেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে। “বিশেষ সামরিক অভিযান ভালো বিষয়, কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বাড়লে আমার লাভ কী?” প্রশ্ন তার।
অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে লিফট অচল, পাইপ ফুটো; মেরামতের উদ্যোগ নেই। ক্ষোভ থাকলেও অধিকাংশ মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদে নামছেন না। অনেকেই মনে করেন, পরিস্থিতি বদলানোর ক্ষমতা তাদের হাতে নেই।
দীর্ঘতম যুদ্ধের পথে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের লড়াইয়ের সময়কালকে ছাড়িয়ে এই সংঘাত এখন রাশিয়ার আধুনিক ইতিহাসে দীর্ঘতম সামরিক অভিযানে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধ যখন পঞ্চম বছরে প্রবেশ করছে, তখন রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে মানুষের মনে আশাবাদ কম, অনিশ্চয়তা বেশি। অনেকেই এখন প্রকাশ্য বিতর্ক এড়িয়ে ব্যক্তিগত জীবন ও টিকে থাকার সংগ্রামেই মনোযোগী। একটি ‘সুন্দর আগামীর’ প্রত্যাশায়।








