ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) দেশীয় শিক্ষার্থীদের সাথে সাথে প্রতিবছরই বিদেশী শিক্ষার্থীদের আগমন ঘটে। অন্যান্য দেশের তুলনায় খরচের পরিমাণ কম হওয়ায় ইবিতে অধিকাংশই ভারত, নেপাল, গাম্বিয়া, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে।
তবে ভারত ও নেপালের শিক্ষার্থীরা আসার কয়েকদিনের মধ্যে বাংলা ভাষা শিখতে পারলেও গাম্বিয়া, সোমালিয়া এবং নাইজেরিয়ার শিক্ষার্থীদের জন্য তা সময়সাপেক্ষ। ফলে শিক্ষকের বাংলায় দেওয়া লেকচার বুঝতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগে অনেক বিদেশী শিক্ষার্থীরা ইবিতে পড়তে আসলেও দিনে দিনে কমে আসছে এর সংখ্যা। কারণ হিসেবে কেউ কেউ দায়ী করছে সেশনজট-সহ আবাসিক সমস্যা, শিক্ষকের বাংলায় পাঠদান, প্রশাসনের উদাসীনতা এবং বিভাগ সংশ্লিষ্টদের অসহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব।
কম্পিউটার সাইন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নেপাল থেকে আসা এক বিদেশী শিক্ষার্থী সাজিদ রাইন বলেন, চেয়েছিলাম স্নাতক শেষ করে দেশে ফিরে গিয়ে চাকরি করব। কিন্তু ভর্তি হওয়ার চার বছর অতিক্রম করলেও এখনো তৃতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারেই পড়ে আছি। সেশনজটের কারণে দুশ্চিন্তায় রয়েছি কখন স্নাতক শেষ করব। এখানকার বেশিরভাগ শিক্ষকই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। এক একটা সেমিস্টারের ফলাফল দিতে সময় লাগায় দুই মাসের অধিক। যার ফলে আমরা সেশনজটে ভুগি। আমরা বিদেশী শিক্ষার্থী হিসেবে কোনো শিক্ষকের নিকট থেকে আলাদা সৌহার্দ্য পাই না। বিদেশ থেকে এসে আমাদের পক্ষে ৬ বছরে স্নাতক সম্পূর্ণ করা অভিশাপের মতোই।
ফার্মেসি বিভাগের নেপালের আরেক শিক্ষার্থী ইরফান বলেন, আমরা পরীক্ষার প্রবেশপত্র স্বাক্ষর করাতে গেলে অফিসের স্টাফ আমাদের কোনো প্রাধান্য না দিয়ে তাদের কাজে ব্যস্ততা দেখায়। আমাদের ওয়াইফাই নষ্ট, ডাটা কিনে পরিবারে ফোন করতে হয়, বিভিন্ন সময় অনলাইন ক্লাস করতে হয় যার ক্রয়মূল্য অনেক। বাবা মা আমাদের এখানে পড়তে পাঠিয়েছে কত স্বপ্ন নিয়ে তবে আমাদের কাছে এই পরিবেশ গুলো দুঃস্বপ্নের মতো।
এছাড়াও বিভাগের বেশির ভাগ শিক্ষকই বাংলায় ক্লাস নেন। শিক্ষার্থীদের বারবার অনুরোধের পরও তারা ইংরেজিতে লেকচার দেন না এবং পরবর্তীতেও আলাদা ভাবে তাদের বুঝিয়ে দেন না। ফলে সোমালিয়া, নাইজেরিয়া থেকে বেশীরভাগ শিক্ষার্থীই ডিগ্রী সম্পূর্ণ না করেই ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমির শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার সূত্রে জানা যায়, ইবিতে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে। সে বছর এমফিলে ২ জন, স্নাতকোত্তরে ৪ জন এবং স্নাতকে ১ জন ভর্তির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশী শিক্ষার্থীর আগমন শুরু হয়। কিন্তু এর মধ্যে শুধু ৩ জন শিক্ষার্থী তাদের স্নাতকোত্তর শেষ করেন। বাকি শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জনের আগেই ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়। করোনা পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ ২০২০-২১ এ বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তিতে ধস নামে। স্নাতকে মাত্র ১ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় সেবছর। সর্বশেষ ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। তবে সেশন জটিলতায় ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে কোনো বিদেশী ভর্তি করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি।
বিদেশী শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক অধ্যাপক ড. আবু হেনা মোস্তফা জামাল বলেন, ভর্তি কার্যক্রমে সব জায়গায় কিন্তু নির্দিষ্ট প্রসিডিউর আছে সেইটা মেইনটেইন হচ্ছে কিনা, সেটা আমি জানি না। তবে যখন আমরা তাদের ভেরিফিকেশনের কাগজ চাচ্ছি বা অন্যান্য কাগজগুলো চাচ্ছি তখন পরবর্তীতে স্টুডেন্টটি আর আবেদন করছে না। তবে আবাসিক সমস্যা, ক্লাসে শিক্ষকদের অসহযোগিতা, সেশনজট, শিক্ষক সংকট মূলত এইসব কারণেই বিদেশী শিক্ষার্থীরা আসতে চায় না।
তিনি আরও বলেন, ছেলেদের জন্য হলের ব্যবস্থা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নাই। ফলে তাকে দেশীয় শিক্ষার্থীদের সাথে রুম শেয়ার করে থাকা লাগছে। হলেও দেখা গেলো কোনো সুযোগ সুবিধা নাই। পানির ফিল্টার নষ্ট হয়ে থাকে, নেটের সুযোগ সুবিধা থাকে না।
‘এছাড়াও আমাদের বিভাগগুলোতে বাংলায় পাঠদান হয়। আমি অনেকবার বলেছি এখানে ইন্টারন্যাশনাল শিক্ষার্থী আছে আপনারা ইংলিশে ক্লাস নেন। আমি একটি ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানকে যখন এই কথা বলি তখন সে বলে কি আমি একজনের জন্যতো উনপঞ্চাশ স্টুডেন্টের ক্ষতি করতে পারি না। এখন নেপালীরা আসলে কিছুদিন পর বাংলা ভাষাটা শিখে যায় কিন্তু অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীরা এসে আর কি করবে ওরাও এসে আবার চলে যায়।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম বলেন, বিদেশী শিক্ষার্থীগুলো মূলত কৃষিতে এবং মেডিক্যাল গুলোতে আসে। কিছু জায়গায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও আসে। ঢাবিতেও এখন একেবারে নেই বললেই চলে। তবে মূল পরিস্থিতিটা যে কি আমাদের ডিরেক্টর আছে তিনি ভালো জানেন। আমি মনে করি স্কলারশিপ না পাওয়া একটা বড় কারণ। অন্য দেশে পার্টটাইম কাজের সুযোগ আছে যা এই দেশে নেই। ভাষাগত একটা সমস্যা আছে। সেইক্ষেত্রে শিক্ষকরা যদি আলাদা একটা নজর দেয় তাদের প্রতি তবে এইটা থাকত না। যেসব বিভাগে জট আছে বিদেশীদের কথা চিন্তা করে হলেও বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, যার এই সেলের দায়িত্বে আছেন তারা আমাকে এই সীমাবদ্ধতাগুলো জানান না।








