রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে একটি আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় উঠে এসেছে হৃদয়বিদারক এক বাস্তবতা। বাঁচার শেষ আশ্রয় ছাদে পৌঁছাতে না পারায় প্রাণ হারাতে হয়েছে শিশু ও নারীসহ দুই পরিবারের ছয় সদস্যকে।
গত শুক্রবার সকালে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের ছয়তলা ওই ভবনে আগুন লাগে। ধোঁয়া ও আগুন ছড়িয়ে পড়লে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার বাসিন্দারা প্রাণ বাঁচাতে ছাদের দিকে ছুটে যান। তবে ছাদের গেটে তালা থাকায় তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বাধ্য হয়ে তারা নিজ নিজ ফ্ল্যাটে ফিরে যান। এ সময় বাসার প্রধান দরজা খোলা থাকায় কালো ধোঁয়া ভেতরে ঢুকে পড়লে তারা একে একে অচেতন হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে ছয়জনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।
নিহতরা হলেন—ওই ভবনের পঞ্চম তলার বাসিন্দা এসকেএফের কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি, তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার ও তাদের দুই বছরের সন্তান কাজী ফাইয়াজ এবং ষষ্ঠ তলার বাসিন্দা ফল ব্যবসায়ী হারেছ উদ্দিন, তার ছেলে রাহাব উদ্দিন ও ভাতিজি রোদেলা আক্তার।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, আগুনের সূত্রপাত হয় ভবনটির দোতলার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের ডাইনিং রুম থেকে। ভেতরে কাঠের সিঁড়ি থাকায় আগুন দ্রুত তিনতলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এতে পুরো ভবন মুহূর্তেই ধোঁয়ার ফাঁদে পরিণত হয়।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশনস) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘটনার তদন্তে ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির সদস্য ও ফায়ার সার্ভিস ঢাকা অঞ্চল-৩-এর উপসহকারী পরিচালক আবদুল মান্নান বলেন, যারা দরজা বন্ধ করে বাসার ভেতরে অবস্থান করেছিলেন, তাদের সবাইকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ছাদের গেট খোলা থাকলে হতাহতের সংখ্যা কম হতে পারত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে গেট কেটে মোট ১৩ জনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠান। তাদের মধ্যে সাতজন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহতদের স্বজনদের পক্ষ থেকে কোনো মামলা বা অভিযোগ করা হয়নি। উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী রফিক আহমেদ জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
নগরবাসী বলছে, আবাসিক ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা, বিশেষ করে ছাদের গেট সব সময় খোলা রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একটি তালাবদ্ধ গেট যে কীভাবে মুহূর্তে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, উত্তরার এই ট্র্যাজেডি তার নির্মম উদাহরণ হয়ে থাকল।








