রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পেরিয়েছে ১২ দিন। ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক দোকান পুড়ে যেমন ছাই হয়েছে, তেমনই নিঃস্ব হয়েছেন বহু মানুষ। এর মধ্যেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। এর ভিতরেই তাদের মাঝে ভর করেছে শঙ্কাও।
সোমবার কৃষি মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংসস্তুপের পরিণত হওয়া দোকানের সামনেই ত্রিপল টাঙিয়ে দোকান পেতে বসেছেন অনেক ব্যবসায়ী। আবার পুড়ে যাওয়া মার্কেটের সামনে ও আশেপাশে অস্থায়ী দোকান খুলে মালপত্র বিক্রির চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। কেউ চৌকি পেতে, আবার কেউ ভ্যানগাড়িতে পোশাক, জুতা, ক্রোকারিজ, মুদি মালামাল নিয়ে বসেছেন। সেখানে ক্রেতাদের সমাগমও আছে। আগের তুলনায় ক্রেতার সংখ্যা কম হলেও ব্যবসায়ীরা আশা করছেন আবারও জমজমাট হয়ে চিরচেনা রূপে ফিরবে কৃষিমার্কেট।
বিশাল কৃষি মার্কেটে প্রায় ৫০০টির মতো দোকান রয়েছে। এর মধ্যে ১০০টি দোকান পুড়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া দোকানগুলোতে মূলত কাপড়, মুদি, সবজি ও স্বর্ণের দোকান ছিল। যার মাঝে মুদি ও সবজির দোকানিরা বাইরে অবস্থান নিয়ে ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করতে পারলেও স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা এখন পর্যন্ত দোকান খুলেননি। একরাশ হতাশা নিয়ে দোকানের সামনে চেয়ার পেতে বসে আছেন।
নিজের পুড়ে যাওয়া দোকানের সামনে ত্রিপল টাঙিয়ে মুদির নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ইশতিয়াক আলী। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো কী অবস্থা এখন তার ব্যবসার। তিনি বলেন: কিছু বের করতে পারিনি। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বাড়িতে বসে থাকলে তো আর পেট চলবে না। আত্মীয়-স্বজন যার কাছ থেকে যেমন পারি ১০ হাজার ২০ হাজার টাকা ধারদেনা করে আবারও মাল তুলেছি সপ্তাহ খানেক হলো।
বেচা-কেনা কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন: সবাই জানে আগুনে মার্কেট পুড়ে গেছে। তাই অনেকে এখানে আসছে না। আসে-পাশের বাসিন্দারা আসছে। আগের তুলনায় কেনা-বেচা কম। কিন্তু আস্তে আস্তে ক্রেতারা আসতে শুরু করেছে। আশা করছি আমাদের ব্যবসা আবারও আগের অবস্থায় ফিরবে।

এদিকে অনেকটা হাকডাক দিয়ে ছাড় দিয়ে তৈজসপত্র বিক্রি করছেন কবির হোসেন। পোড়া দোকানের সামনে ভ্যান রেখে বেচা বিক্রি চালাচ্ছেন তিনি। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো ছাড় দিয়ে বিক্রির কারণ কী? তিনি বলেন: এমনিতে ক্রেতা কম। তার ওপর আমার অনেক মাল আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিছু ছাড় দিয়ে হলেও গোডাউনে থাকা মালগুলো বিক্রি করে কিছু পুঁজি দাঁড় করাতে চাইছি। যেন আবার ব্যবসাটা শুরু করতে পারি।
তার মত আর গোট দশেক ব্যবসায়ী ভ্যানে তুলে তৈজসপত্র বিক্রি করছেন। ইশতিয়াক-কবিরের মতো গল্প আর সবার।
এমন ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রামের মাঝে শঙ্কাও ভর করেছে কৃষি মার্কেটের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মাঝে। তারা চাইছেন পুড়ে যাওয়া দোকানগুলোর জায়গায় আবারও আগের মতো টিন শেড তুলে দোকান চালু করতে। নানা মহল থেকে আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিলো তাদের। গতকাল রোববার ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ১ হাজার বান্ডিল টিন ও নগদ ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণায় তাদের সে আশায় জোয়ার পায়।
কিন্তু আজ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের কৃষি মার্কেটে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করার কথা থাকলেও তা বাতিল হওয়ায় শঙ্কা ভর করেছে ব্যবসায়ীদের মনে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী আমীর হোসেন (ছদ্মনাম) অভিযোগ করেন: কাল তো শুনছিলাম মন্ত্রী টিন দিয়েছে আর টাকা দিয়েছে সেটা দিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে দোকানগুলো মেরামত করে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু আজ শুনছি মেয়র এখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে চাইছেন। সিটি করপোরেশন দোকান বাড়াতে চায়। এই টিন আর টাকা দিয়ে দোকান নির্মাণ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত জায়গা ঘিরে রাখা হবে। মেয়র সাহেব আজ আসতে চেয়েছিলেন। প্যান্ডেল-চেয়ার টেবিল সব আনা ছিলো। কিন্তু তিনি আসলেন না। সব ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জানি না কী হবে!
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মকবুল হোসাইন হোসেন জানান: অনিবার্য কারণে ডিএনসিসির মেয়র জনাব মো. আতিকুল ইসলামের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত মোহাম্মদপুর নতুন কাঁচা বাজার (কৃষি মার্কেট) পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুর্নবাসনের লক্ষ্যে মত বিনিময় সভাটি স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী তারিখ ও সময় যথাসময়ে জানিয়ে দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে পুড়ে যাওয়া মার্কেটের সভাপতি স্থানীয় কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু’র সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভোর ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে কৃষি মার্কেটে আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের ১৭টি ইউনিট প্রায় ৫ ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।








