টানা তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমের পর রাজধানীতে শুরু হওয়া বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও কোরবানির পশুর হাট ও ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রায় নতুন ভোগান্তি তৈরি করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাটে কাদা ও পানি জমে দুর্ভোগে পড়েছেন ক্রেতা–বিক্রেতারা। একই সঙ্গে সড়কে যানজট ও ধীরগতির কারণে বাড়ছে যাত্রীদের দুর্ভোগও।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী থেকে আবদুল মালেকসহ ছয়জন ২০টি গরু নিয়ে এসেছেন রাজধানীর আফতাবনগর পশুর হাটে। ভালো দামের আশায় গত শুক্রবার রাতে প্রথমবারের মতো এই হাটে আসেন তাঁরা।
রোববার রাতে মুষলধারে বৃষ্টির পর আবদুল মালেক বলেন, এখন পর্যন্ত মাঝারি আকারের মাত্র দুটি গরু বিক্রি হয়েছে। তাঁর আশা ছিল বিক্রি আরও বেশি হবে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে হাটে ক্রেতার উপস্থিতি কমে গেছে। এ ছাড়া আগেভাগে গরু কিনলে ঢাকায় সেগুলো রাখার ঝামেলাও আছে।
তিনি বলেন, কয়েক দিনের টানা গরমে গরুগুলো বেশ কাহিল হয়ে পড়েছিল। দিনে কয়েকবার পানি ঢেলে শরীর ঠান্ডা রাখতে হয়েছে। বৃষ্টিতে পশুগুলো কিছুটা স্বস্তি পেলেও বিক্রিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
এমন দুশ্চিন্তা শুধু আবদুল মালেকের নয়; রাজধানীর প্রায় সব পশুর হাটে আসা খামারি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেই একই শঙ্কা কাজ করছে। টানা বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাস তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সোমবার ২৫ মে দুপুরের পর ঢাকায় টানা এক ঘণ্টার বেশি বৃষ্টি হয়। এতে রাজধানীর পশুর হাটগুলোর পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদ পর্যন্ত এমন আবহাওয়া চলতে থাকলে বিক্রি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এরই মধ্যে আবহাওয়া অধিদপ্তর কালবৈশাখী ঝড়ের সতর্কবার্তাও দিয়েছে।
এবার রাজধানীতে ২১টি অস্থায়ী পশুর হাট বসেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১১টি এবং দক্ষিণে ১০টি।
হাটগুলোতে বাঁশের খুঁটি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হলেও ভারী বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি দ্রুত সরানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে পানি, গোবর ও ভেজা খড়কুটোয় হাটের পরিবেশ কর্দমাক্ত হয়ে পড়েছে। এতে ক্রেতা–বিক্রেতাদের চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, রোববার থেকেই পশুর হাটগুলোতে ক্রেতা ও বিক্রেতার ভিড় বাড়তে শুরু করেছিল। তবে জমে ওঠার আগেই বৃষ্টি বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশে বিঘ্ন ঘটিয়েছে।
আফতাবনগর পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, শেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত ব্যবসায়ী গরু নিয়ে এসেছেন। কয়েক দিনের তীব্র গরমে পশুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও বৃষ্টিতে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। তবে সেই স্বস্তি এখন নতুন করে উৎকণ্ঠায় রূপ নিয়েছে।
কাজলা ও হাজারীবাগ পশুর হাটেও একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হাজারীবাগ হাটে পানি জমার পাশাপাশি তীব্র যানজটের কারণে অনেকেই হাটে ঢুকতে পারছেন না।
বিক্রেতারা বলছেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে নিচু এলাকাগুলো কাদা ও পানিতে ভরে যাবে। এতে হাটের পরিবেশ যেমন খারাপ হবে, তেমনি দূর–দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারাও হাটে আসতে অনাগ্রহী হয়ে পড়বেন। কাদার মধ্যে গরু সামলানো ও সুস্থ রাখা তখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
কুষ্টিয়া থেকে আসা ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, ‘গরমে গরুগুলো খুব কষ্টে ছিল। বৃষ্টির পর কিছুটা আরাম পেয়েছে। কিন্তু এখন যদি ঝড়–তুফান শুরু হয়, তাহলে ত্রিপল দিয়েও গরু রক্ষা করা কঠিন হবে। কাদা হলে মানুষ হাটে আসবে না। তখন বাধ্য হয়ে কম দামে গরু বিক্রি করতে হবে।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ক্রেতা কমে গেলে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। একদিকে নোংরা পরিবেশ, অন্যদিকে পশুর অতিরিক্ত পরিচর্যা ব্যয়—সব মিলিয়ে বড় আশা নিয়ে রাজধানীতে আসা খামারি ও ব্যবসায়ীরা এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
এদিকে বৃষ্টির কারণে ঈদযাত্রাতেও ভোগান্তি বেড়েছে। সোমবার দুপুরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি শুরু হলে অনেক সড়কে পানি জমে যানবাহনের গতি ধীর হয়ে পড়ে। ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের চাপ আগে থেকেই বেশি থাকায় বৃষ্টির পর দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
বিশেষ করে সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, ধোলাইপাড় ও গাবতলী এলাকায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় বাসের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
যাত্রাবাড়ীতে বরিশালগামী যাত্রী রাকিব ইসলাম বলেন, ‘গরমের মধ্যে বৃষ্টি হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। কিন্তু রাস্তায় পানি জমে যাওয়ায় গাড়ি খুব ধীরে চলছে। সকাল থেকে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি।’
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঈদযাত্রা ও পশুর হাটে চলাচলের ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এদিকে সোমবার সকালে রাজধানীর গাবতলী পশুর হাট পরিদর্শন শেষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, পশুর হাটে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, পশুর হাটে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা তদারকি করছে। হাটের কারণে ঘরমুখো মানুষ যেন ভোগান্তিতে না পড়ে, সে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, পশুর হাটে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে পুলিশ। চুরি–ছিনতাই বা ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।








