১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদ শহীদুল হকের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা চায় তার পরিবার। বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এ সংক্রান্ত একটি মানবিক আবেদন জানিয়েছেন শহীদ পরিবার।
শহীদের কন্যা, বিশিষ্ট ইসলামী সংগীতশিল্পী ও গীতিকার শাহানা হক ডেইজি বলেন, “আমার বাবার আত্মত্যাগ যেন ইতিহাসে হারিয়ে না যায়। তার স্বীকৃতি শুধু আমাদের পরিবারের জন্য নয়, বরং জাতির জন্যও একটি নৈতিক দায়মুক্তির প্রতীক হবে।”
১৯৩৫ সালে চাঁদপুর জেলার কচুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন শহীদুল হক। তার বাবা গোলাম মাওলা ছিলেন এক সময়ের খ্যাতিমান পুলিশ কর্মকর্তা এবং মা রদইসুন্নেসা একজন প্রেরণাময়ী নারী। তিনি কুমিল্লা জেলা স্কুল, সিলেট এমসি কলেজ ও পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে জার্মানির একটি কোম্পানিতে চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করতেন তিনি।
সামাজিক উন্নয়নে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বরিশালের মনপুরা অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ ও পুনর্বাসনে কাজ করেন হেল্প সংগঠনের মাধ্যমে, যেখানে তার সহকর্মী ছিলেন পরবর্তীতে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশের প্রতি দায়িত্ববোধকে সবার ওপরে স্থান দেন শহীদুল হক।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি চট্টগ্রাম ক্যাম্পে অবস্থান করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্য, ওষুধ ও কাপড় সরবরাহ করতেন। নানা জায়গায় পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখেও তিনি দেশপ্রেমে অটল থাকেন। কখনো মাটির গর্তে লুকিয়ে, কখনো সামান্য খাবার খেয়ে ১৪ দিন পার করেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে।
শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের একদিন পাকিস্তানি বাহিনী শহীদুল হকের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। তখন তিনি শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নেন। পাকিস্তানি বাহিনী সেখানেও হানা দিয়ে শহীদুল হক, তার দুই শ্যালক ও এক খালুকে আটক করে। তখন বাড়ির পাশে থাকা মাজারের খাদেমরা তাঁকে রক্ষায় এগিয়ে আসে। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের ও পরিবারের সদস্যদের প্রতিশ্রুতি দেয়, জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তিন দিন পর আধা কিলোমিটার দূরে তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়।
এমন আত্মত্যাগের পরও শহীদুল হক কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। শাহানা হক বলেন, “আমার মা অনেক কষ্টে আমাদের মানুষ করেছেন। বাবার আত্মত্যাগের স্বীকৃতি না পাওয়া আমাদের পরিবারের গভীর বেদনার বিষয়।”
তিনি প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘‘আমার বাবার আত্মত্যাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিন। এই স্বীকৃতি জাতিকে ইতিহাসের দায়মুক্তি দেবে।’’








