বাংলাদেশ, নেপাল, ফিলিপিন্স, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামসহ কলম্বো প্রসেসের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা ঢাকায় একটি বৈঠকে যোগ দিয়ে বলেছেন, অভিবাসীদের জন্য নিরাপদ অভিবাসন ও কাজ নিশ্চিত করার জন্য ন্যায্য এবং নৈতিক নিয়োগ নিশ্চিৎ করা প্রয়োজন।
অভিবাসীদের সমস্যা মোকাবেলায় নীতি ও বিধিসমূহের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য ঢাকায় কলম্বো প্রসেসের থিম্যাটিক এরিয়া ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্যরা দু’দিন ব্যাপি (২৪-২৫ আগস্ট) আলোচনায় যোগ দেন। বৈঠকে আলোচকরা বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিবাসী প্রেরণকারী দেশগুলোর জন্য নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হলো অভিবাসনে নৈতিক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
কলম্বো প্রসেস টেকনিক্যাল সাপোর্ট ইউনিট (সিপিটিএসইউ) এবং আইওএম বাংলাদেশের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকারের সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকায়।
বিশ্ব অভিবাসন প্রতিবেদন ২০২২ অনুযায়ী, ১৯৭০ সালে সরা বিশ্বে ৮৪ মিলিয়ন অভিবাসী ছিলেন যা ২০২0 এসে দাঁড়ায় ২৮১ মিলিয়নে। বর্তমান বিশ্বের ৩.৬ শতাংশ মানুষ অভিবাসী। অভিবাসীরা তাদের জ্ঞান, নেটওয়ার্ক এবং দক্ষতা দিয়ে নিজ দেশ এবং গন্তব্য দেশগুলির উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।
বিশ্বব্যাপি অভিবাসী পাঠানোর গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। কলম্বো প্রসেস হলো ১২টি এশীয় দেশের একটি আঞ্চলিক পরামর্শমূলক প্লাটফর্ম যা অভিবাসীদের সুরক্ষা এবং পরিষেবার জন্য কাজ করে। একই সাথে কলম্বো প্রসেস অভিবাসী এবং তাদের পরিবারের জন্য শ্রম অভিবাসনের সুবিধাগুলিকে নিশ্চিতের জন্য কজা করে। প্লাটফর্মটি এই অঞ্চলে অভিবাসীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশগুলোর সরকার মনে করে যে অভিবাসন সমস্যা একতরফাভাবে সমাধান করা সম্ভব না।
কলম্বো প্রসেস পাঁচটি বিষয়ভিত্তিক অগ্রাধিকার নিয়ে কাজ করে: দক্ষতা এবং যোগ্যতার স্বীকৃতি প্রক্রিয়া; নৈতিক নিয়োগের অনুশীলন; প্রস্থান-পূর্ব ধারণা প্রদান এবং ক্ষমতায়ন; কম খরচে, দ্রুত ও নিরাপদে রেমিট্যান্স প্রেরণ; এবং শ্রম বাজার বিশ্লেষণ।
‘নৈতিক নিয়োগের অনুশীলন’ বিষয়ে গঠিত থিম্যাটিক এরিয়া ওয়ার্কিং গ্রুপের ঢাকার বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলি অভিবাসী নিয়েগোর ক্ষেত্রে ‘কর্মচারী-বেতন মডেল’ থেকে ‘নিয়োগকর্তা-বেতন মডেল’-এ রূপান্তরিত করার লক্ষ্যগুলিকে আরও এগিয়ে নিতে তাদের চার বছরের কাজের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। পরিকল্পনার মধে আরো আছে, অনানুষ্ঠানিক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় অন্তর্ভুক্তিকরণ নিশ্চিত করা; এবং অভিবাসী কর্মীদের উপযুক্ত কর্ম এবং নিরাপদ অভিবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা।
দু’দিনের বৈঠকের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন বলেন, “অভিবাসী শ্রমিকরা অনেক সময় শোষণের শিকার হয়, যা নিয়োগের সময়ই শুরু হয়। অভিবাসনে নৈতিক নিয়োগের অনুশীলন নিশ্চিত করার জন্য প্রেরণ এবং গ্রহণ উভয় দেশের কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।” তিনি আরো বলেন, “কলম্বো প্রসেস অভিবাসী কর্মীদের সমস্যা সমাধানে আমাদের একটি জুতসই প্লাটফর্ম দিয়েছে।”
বৈঠকে যোগ দিযে আইওএম বাংলাদেশের মিশন প্রধান আবদুসাত্তর এসয়েভ বলেন, “অভিবাসীরা প্রায়শই অনৈতিক নিয়োগের শিকার হন। নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করার জন্য ন্যায্য ও নৈতিক নিয়োগের অনুশীলন করা একটি পূর্বশর্ত। নৈতিক নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য এখন আমাদের হাতে বিশ্বব্যাপি অনেক উদ্যাগ রয়েছে। অভিবাসীদের নিরাপত্তার জন্য এখন সকল পক্ষকে একসাথে কাজ করতে হবে।”
দু’দিনের বৈঠক এবং থিম্যাটিক এরিয়া ওয়ার্কিং গ্রুপের কাজ “গভর্নেন্স অফ লেবার মাইগ্রেশন ইন সাউথ অ্যান্ড সাউথইস্ট এশিয়া” প্রোগ্রামের আওতায় পরিচালিত। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আওএম), ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) এবং ইউএন ওমেন প্রোগ্রামটি বাস্তবায়ন করছে। সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোঅপারেশন (এসডিসি) যেখানে আর্থিক সহযোগিতা করছে।
বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ডের দূতাবাসের চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স (ভারপ্রাপ্ত) সুজান মুলার বলেন, “অনিয়মিত অভিবাসন এবং অভিবাসীদের শোষণ মোকাবেলায় নৈতিক নিয়োগ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নৈতিক নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য অভিবাসী প্রেরণ ও গ্রহণকারী দেশগুলির সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এসডিসি নৈতিক নিয়োগ নিশ্চিতে সরকার, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাবে।”
দুই দিনব্যাপী সভায় বিভিন্ন পক্ষ অভিবাসন ও নৈতিক নিয়োগ বিষয়ে আলোকপাত করেন। আইওএম-এর সিনিয়র লেবার মোবিলিটি এবং সোশ্যাল ইনক্লুশন স্পেশালিস্ট গ্রিক্রুই ল্যানিউ,, ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং ইন্টিগ্রেটিং সিস্টেম (আইআরআইএস) এর উপর একটি বিস্তারিত ধারণা দেন। আইআরআইএস আইওএম-এর একিটি ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ যা অভিবাসী কর্মীদের নৈতিক নিয়োগকে উৎসাহিত করে এবং শ্রম নিয়োগকারী, নিয়োগকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় পক্ষদের জন্য একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হিসাবে কাজ করে যাতে নিয়োগ-সম্পর্কিত ব্যবস্থাপনা, নীতি, প্রবিধান, প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতিতে নৈতিক নিয়োগ নীতিগুলিকে একীভূত করা যায়।
এছাড়া আইএলও-এর মাইগ্রেশন নীতি বিশেষজ্ঞ মারিয়া গ্যালোটি প্রতিষ্ঠানটির ন্যায্য নিয়োগের উদ্যোগ সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের ধারণা দেন। ইউএন উইমেনের প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট নানসিরি ইমসুক রিক্রুটমেন্ট এজেন্সিগুলির জন্য লিঙ্গ-প্রতিক্রিয়াশীল স্ব-মূল্যায়ন টুলের উপর আলোকপাত করেন। দু’দিনের আলোচনায় ৬টি দেশের ৩৫ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।







