চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কাজী আনোয়ার হোসেন: জন্মদিনের শুভেচ্ছা

ফরিদুর রেজা সাগর-এর বই 'প্রিয় মানুষ' থেকে

কবে থেকে তাকে চিনি তা আজ আর মনে নেই। সেই ছোটবেলায় আমার ভেতরে যিনি বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করে দিয়েছিলেন, তিনি কাজী আনোয়ার হোসেন। তিনি এক ভিন্নধারার লেখক। প্রত্যেক মাসেই নিয়মিতভাবে পাঠকদের জন্য উপহার দিয়েছেন মাসুদ রানা। কিশোরদের গোয়েন্দা কাহিনি কুয়াশা সিরিজের বই। নানারকম রহস্য-রোমাঞ্চকর গল্প-উপন্যাস। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন বিখ্যাত সেবা প্রকাশনী। বই প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিমাসে নিয়মিত প্রকাশিত হয় রহস্য পত্রিকা। একদা প্রকাশিত হতো ছোটদের জন্য কিশোর পত্রিকা।

বইয়ের মাধ্যমেই কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে আমার পরিচয়। কারণ কোনো না কোনো বই আমার কাছে সবসময় থাকত। আর আমি অনুভব করতাম কাজী আনোয়ার হোসেনের সাথে আমি সবসময় আছি।

Reneta June

মাসুদ রানা তার অমর সৃষ্টি। মাসুদ রানার ছিল তীব্র দেশপ্রেম। পৃথিবীর যে প্রান্তেই মাসুদ রানা গিয়েছে অভিযানে, কখনো স্বদেশকে সে ভুলে যায়নি। শত বিপদেও মাসুদ রানা দেশের স্বার্থ রক্ষায় অবিচল থেকেছে। কাজী আনোয়ার হোসেনের অমর সৃষ্টি এই মাসুদ রানা। এছাড়াও তার সৃষ্টি কুয়াশা। কুয়াশা খানিকটা কিশোর উপযোগী রচনা। কঠিন সব রহস্য ভেদ করে কুয়াশা।
আর রহস্য পত্রিকার নানা ধরনের মজাদার ফিচার পড়ে আমি এক রোমাঞ্চকর জগতে প্রবেশ করতাম। আসলে সেই জগতে আমি এখনো বসবাস করি। আমার স্বপ্নময় কিশোরবেলা কখনো নষ্ট হয়নি মাসুদ রানা ও কুয়াশার কল্যাণে।

বিজ্ঞাপন

মাসুদ রানা পাঠের নানা অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে। আমরা জানি শূন্যের কোনো মানে নেই। কিন্তু শূন্যের সঙ্গে কোনোকিছু যোগ করলেই নতুন অর্থ তৈরি হয়।

মাসুদ রানা পড়েই সেটা জেনেছিলাম।

পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। আর যদি পেশাদারি মনোভাব নিয়ে কাজ করা যায় তবে কোনো বাঁধাই বাঁধা নয়। যেখানে রাজপথ শেষ হয় সেখান থেকে এই হাইওয়ে ধরে ছুটে চলা। আনন্দ বেদনা থাকবে। আশা নিরাশা থাকবে। সুখ-দুঃখ থাকবে। এই শিক্ষাও আমি পেয়েছি কাজী আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকে।

আমাদের দেশে অনেক পেশাদার লেখক আছেন। যারা অনেক গল্প উপন্যাস লেখেন। দিব্যি নিজের লেখা বলে চালিয়ে দেন। পরে দেখা যায় লেখাগুলো বিদেশি লেখার অনুকরণে রচিত। বাংলাসাহিত্যে এমন উদাহরণ অনেক আছে। কিন্তু কাজী আনোয়ার হোসেন এই ক্ষেত্রে একেবারেই ব্যতিক্রম। মাসুদ রানা বইয়ের শেষ প্রচ্ছদে লেখা থাকে; বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে। যেসব বইয়ের সাহায্য নিয়ে লেখা সে সব বইয়ের নামও উল্লেখ করা থাকে।

মাসুদ রানা সাহসের প্রতীক। জটিল সব সমস্যার সমাধান করে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে মাসুদ রানা অভিযানে অংশ নেয়। আমি জানি না, কাজী আনোয়ার হোসেন দাবার ঘোড়ার পিঠে চড়া ছাড়া আর কোথাও সফর করেছেন কিনা। যদিও শুনেছি, শিকার করা, মাছ ধরা, ছবি তোলা তার হবি। তিনি বাদ্যযন্ত্র বাজাতেও পছন্দ করেন। শাহাদাত চৌধুরী সম্পাদিত বিচিত্রা পত্রিকায় বেশ কয়েকটা দুর্দান্ত ছোটগল্প লিখেছিলেন। সে সব গল্প পাঠের স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে।

মাসুদ রানা এখনো অনেকের প্রিয় চরিত্র। যদি বলি মাসুদ রানা পাঠ করে অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন- সেটা কি বেশি বলা হবে? এখনো অনেকের জীবন সংগ্রামের অনুপ্রেরণা কাজী আনোয়ার হোসেন। আমাদের বিরল সৌভাগ্য যে, তিনি এখনো লিখে যাচ্ছেন।

কাজী আনোয়ার হোসেন আমার জীবনের একজন স্বপ্নপুরুষ কিন্তু এই লেখা লিখতে গিয়ে বিস্মিত হচ্ছি এই ভেবে যে, সমগ্র জীবনে আমি তাকে মাত্র দুইবার দেখেছি। একবার বাংলা একাডেমি বইমেলায় সেবা প্রকাশনীর স্টলে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। খুব ছিমছাম। প্যান্ট শার্ট পরনে। চোখে চশমা। আরেকবার দেখেছি বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠান রেকর্ডিং-এ। বিখ্যাত নির্মাতা অভিনেতা আফজাল হোসেনের ‘আপন প্রিয়’ অনুষ্ঠানে। এটি একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠন। অনুষ্ঠানে তিনি সক্ষাৎকার দিয়েছিলেন।

তিনি গানের মানুষও বটে। বাবা বিখ্যাত অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহের হোসেন। জ্যেষ্ঠ ভগ্নি ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ড. সনজিদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেনের দু-একটি গান ষাটের দশকে মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। ‘রিকশাঅলা বেচারা’। অথবা সুতরাং ছায়াছবির- এই যে আকাশ এই যে বাতাস ইউটিউবে এখনো জনপ্রিয়।

দুবছর আগে একদিন কাজী আনোয়ার হোসেনের সাথে টেলিফোনে কথা হলো। ৫৫ বছর ধরে আমি তার ভক্ত। আবেগতাড়িত হয়ে আমি কখনোই তার সাথে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারিনি।

এই লেখাতেও তার জীবনের দীর্ঘায়ু কামনা করে আর জন্মদিনের শুভেচ্ছা ছাড়া কিছুই জানাতে পারছি না। তবে আমি খুব ভাগ্যবান। এখন আমি প্রতিমাসে মাসুদ রানার নতুন বইগুলো কাজী আনোয়ার হোসেনের স্বাক্ষরসহ উপহার পেয়ে থাকি। বইগুলো আমি সযত্নে সংগ্রহ করে রাখি।
অটোগ্রাফ যে সংগ্রহ করতে হয় সেটাও শিখেছি মাসুদ রানার কাছে।

মাসুদ রানার জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। এখনো মাসুদ রানার একটি বই ভাড়া করে অনেকে পড়ে থাকে। পত্রিকা পাঠের মতো প্রতি মাসে অপেক্ষা করি, কবে মাসুদ রানা প্রকাশিত হবে। মাসুদ রানা কখনো বৃদ্ধ হয় না। আমি যেমন মন দিয়ে এখনো মাসুদ রানা পড়ি ঠিক তেমনি আমার কন্যা মেঘনা-মোহনাও মাসুদ রানা পড়ে। হয়তো মেঘনার ছেলেমেয়েরা বড় হয়েও মাসুদ রানা পড়বে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মাসুদ রানা বেঁচে থাকবে। এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কি আছে!
এই লেখাটা আমি লিখছি নিউইয়র্কে বসে। নিউইয়র্ক এখন প্রায় কোভিড মুক্ত শহর। মাঝে মাঝে ঘুরতে বের হই। ম্যানহাটন, কুইন্স কিংবা জ্যাকসন হাইটস মানুষের মুখের দিকে তাকালেই মনে হয় এদের সবাইকে আমি চিনি। এই শহরে প্রায় একশটি দেশের মানুষ বাস করে। তারা ৩৫০ ভাষায় কথা বলে। চারদিকে বড় বড় দালান। পথের ধারে ধারে রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে। কুইন্সের কোনো গলি দিয়ে গেলে বাঙালি পাওয়া যাবে। কোনো রাস্তা দিয়ে শাঁই শাঁই করে লরি চলছে-সবকিছুই আমার খুব চেনা মনে হয়। কারণ বহু বছর ধরে মাসুদ রানার চোখ দিয়ে এই শহরকে আমি দেখছি।

একই সাথে বলতে পারি আমার ভেতরে দেশপ্রেমের যে বোধ আছে সেটাও কিছুটা পেয়েছি মাসুদ রানার কাছ থেকে। অর্থাৎ কাজী আনোয়ার হোসেনের জন্য। আমি জানি না, কাজী আনোয়ার হোসেনের সামনে এসব কথা কোনোদিন বলা হবে কি না!

তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।