‘আইন তার নিজের গতিতে চলে, আইনের চোখে সকলে সমান’- এই পন্থা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থায় সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুসসহ চারজনের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে শ্রম ট্রাইব্যুনালে যে মামলাটি করা হয় তা এদেশে আইনের শাসন সমুন্নত রাখার একটি অন্যতম উদাহরণ।
একজন নোবেল বিজয়ী হিসেবে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচারিক কার্যক্রম দেশের প্রচলিত আইনের অধীনে সম্পন্ন হচ্ছে। এক্ষেত্রে তার পরিচয় তিনি বাংলাদেশের একজন নাগরিক। দেশের অন্যান্য ব্যক্তির তার ক্ষেত্রেও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া একই ধরনের। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মামলাটি গ্রামীণ টেলিকমে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মচারীদের স্বার্থরক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা না বললেই নয়। গ্রামীণ ব্যাংক এর একজন কর্মচারীর কান্না শুনে গ্রামের মানুষ কারণ জানতে চাইলে, তিনি বললেন, এক বছর আগে নেয়া ঋণ শোধ না করে একজন নারী বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়েছে।
এখন এই ঋণ সেই কর্মচারীকে শোধ করতে হবে, আর না পারলে তার চাকরীটি থাকবে না। অর্থাৎ কর্মচারীর চাকরীটাই ছিল সেই ঋণের মর্টগেজ। ঘটনাটিতে বিশ্লেষণ করলে সহজেই এই কর্মসূচিতে শ্রমিকের বা কর্মচারীর চাকরীর সাথে সংশ্লিষ্ট স্বার্থ রক্ষার নীতির দুর্বলতাটি অনুমান করা যায়। তাছাড়া মাঝে মধ্যে ঋণ শোধ করার ব্যবস্থা না থাকায় শোধের ভয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে বাঁচা যেন ঋণ গ্রহীতার একমাত্র সমাধান হয়ে দাঁড়ায়।
গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি গরীবের অবস্থার উন্নয়নের জন্য করা হলেও এমন ঘটনা এই ধরনের কর্মসূচির ক্ষেত্রে খুব সাধারণ ও অহরহ। ফলে অস্বীকারের উপায় নেই যে জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ টেলিকমের যাত্রা শুরু হয়। তবে এর গঠনতন্ত্র ও পরিচালনা পর্ষদের অস্বচ্ছতার কারণে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর মামলাটি করে।
অভিযোগ হলো শ্রম আইন ২০০৬ ও শ্রমবিধিমালা ২০১৫ অনুযায়ী গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক বা কর্মচারীদের শিক্ষানবিশকাল পার হলেও তাদের নিয়োগ দেয়া হয়নি। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের মজুরিসহ বার্ষিক ছুটি নগদায়ন ও ছুটির বিপরীতে নগদ অর্থ দেয়া হয়নি, শ্রমিক তহবিল গঠন ও ৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে আইন অনুযায়ী জমা হয়নি ইত্যাদি।
মামলার বিষয়ে গ্রামীণ টেলিকমের পক্ষ থেকেও বক্তব্য পেশ করা হয়। মামলাটি ২০২১ সাল থেকে শুরু হয়। গত ২ জানুয়ারি ২০২৪ সালে আদালত অর্থনীতিবিদ ড. ইউনুসকে ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন এবং উচ্চ আদালতে আপিল করার শর্তে এক মাসের জামিন দেয়। তার বিরুদ্ধে দুদকের মানি লন্ডারিং মামলাটিও চলমান।
এতে পরিষ্কার যে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। কিন্তু মামলা ও শাস্তির বিষয়ে গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. ইউনুসের ‘অপরাধ না করে শাস্তি পাওয়া’ সংক্রান্ত বক্তব্য, রাষ্ট্রের কিছু বিশিষ্ট নাগরিক কর্তৃক এটিকে ‘হয়রানিমূলক’ মামলা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা এবং ড. ইউনূসকে নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে নানা ধরণের মন্তব্য এই মামলাটিকে অনেকটা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে। বিশেষ করে আমেরিকার কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ গত কয়েক বছর ধরেই ড. ইউনূস ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের উপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। গত ৩০ জানুয়ারি রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ১৪টি দেশের নন-রেসিডেন্স রাষ্ট্রদূত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদের সাথে দেখা করেন।
নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তারা ড. ইউনূসের বিষয়ে কথা বলেন। এদিকে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় ‘ ধারাবাহিক বিচার বিভাগীয় হয়রানি এবং কারাদণ্ড’ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি পাঠান শতাধিক নোবেল বিজয়ীসহ বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ২৪২ ব্যক্তি। এদের মধ্যে নোবেল বিজয়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর অন্যতম।
এই চিঠিটি মূলত ১ জানুয়ারিতে মামলার প্রকাশিত রায়কে কেন্দ্র করে পাঠানো হয়। এ নিয়ে ড. ইউনূস ইস্যুতে তৃতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রীকে খোলা চিঠি পাঠানো হয়। গত আগস্টের চিঠির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ড. ইউনুসের বিরুদ্ধে চলা মামলার দলিল-দস্তাবেজ খতিয়ে দেখার জন্য তাদের আমন্ত্রণ করেন।
৩০ জানুয়ারির চিঠিতে তারা এ আমন্ত্রণ গ্রহণের কথা জানান। তারা বিচারকার্য পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিনিধিদল প্রেরণ ও কার্যক্রম চলাকালে ড. ইউনূস ও তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের রায় স্থগিত রাখার আহ্বান জানান। এভাবে কোন দেশের অভ্যন্তরে সেই দেশের নাগরিকের বিরুদ্ধে চলা মামলায় অন্য কোন দেশের হস্তক্ষেপ কতটুকু সমীচীন, তা তারা একরার ভেবে দেখবেন। এটিও স্মরণে রাখা প্রয়োজন, একজন ব্যক্তি মেধাবী, বিখ্যাত হলেই তিনি নীতিবান এবং নিরপরাধ হন না।
পৃথিবীজুড়ে এরূপ বহু উদাহরণ পাওয়া যায়। ড. ইউনূস একজন নোবেল বিজয়ী হলেও তার ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া এবং পরবর্তীতে ১২ কোটি টাকা ট্যাক্স পরিশোধের ঘটনা রয়েছে। তিনি ইতিমধ্যে আদালতে শ্রম আইনে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। সেখানে তিনি আইনের মাধ্যমে নিজেকে নির্দোষও প্রমাণ করতে পারেন। এখানে কোন চাপ ও উৎকণ্ঠার স্থান নেই।
ড. ইউনুসকে নিয়ে উদ্বিগ্ন বিদেশি বন্ধুদের এ ধরণের আচরণ অন্য দেশের আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের সামিল। বিশেষ করে ড. ইউনূসের বিষয়টি বাংলাদেশের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন পূর্ববর্তী ও নির্বাচন পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে প্রভাবিত করেছে এবং করছে বলেও অনেকে মনে করেন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি দেশে ন্যায় বিচার না পেলে অবশ্যই আন্তর্জাতিক আদালতে ন্যায় বিচারের আবেদন করতে পারে। সে পথটি ড. ইউনূসের জন্য নিশ্চয়ই খোলা আছে। একজন বিবেকবান, মেধাবী ও দায়িত্বশীল নাগরিকের কাছে এটিই কাম্য।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








