এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
খন্দকার মাজেদুল ইসলাম সম্রাট
মুসলিম বিবাহ একটি সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তি সম্পাদনের অন্যতম শর্ত দেনমোহর। দেনমোহর বিয়ের একটি অলঙ্ঘনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিধি। দেনমোহর ধার্য করা ছাড়া এবং দেনমোহর ব্যতীত কোন মুসলিম বিবাহ বৈধ হয় না। এটা স্ত্রীর প্রাপ্য। বিয়েতে ধার্যকৃত দেনমোহর স্বামীকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। দেনমোহরের পরিমাণ কম বেশি যাই হোক না কেন, এই নিয়ম অবশ্যই পালন করতে হয়।
দেনমোহর কী
দেনমোহর স্ত্রীর অধিকার। এটি মুসলিম বিয়ের অন্যতম শর্ত। এই শর্ত অনুযায়ী স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে বিয়ের সময় কিছু অর্থ বা সম্পত্তি পেয়ে থাকে বা পাওয়ার অধিকার লাভ করে। বিয়ে ধার্য করার কথা এলেই প্রথমে দেনমোহর চূড়ান্ত করতে হয়। দেনমোহর চূড়ান্ত করার মাধ্যমে বিয়ের সময় ও ক্ষণ নির্ধারিত হয়। এটি স্ত্রীর একটি বিশেষ অধিকার। স্ত্রীকে ছোঁয়ার আগে এ অধিকার স্বামীকে আদায় করতে হয়।
দেনমোহর প্রদানে ধর্মীয় নির্দেশ
বিয়ের সময় স্ত্রীকে দেনমোহর প্রদান করা স্বামীর ওপর ফরজ করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা সূরা আন-নিসা এর ৪ নং আয়াতে বলেন–
“আর তোমাদের স্ত্রীদের তাদের দেনমোহর দিয়ে দাও খুশি মনে। অবশ্য স্ত্রী চাইলে দেনমোহর কিছু অংশ কিংবা সম্পূর্ণ অংশ ছেড়ে দিতে পারে।”
এ ছাড়া কুরআনের সূরা আল-আহজাব এর ৫০ নং আয়াতে দেনমোহরের অধিকার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “হে নবী! আমি তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার স্ত্রীদেরকে, যাদের দেনমোহর তুমি প্রদান করেছো।”
দেনমোহর প্রদানে হাদিসে কঠোর নির্দেশ রয়েছে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মেয়েকে দেনমোহর দেওয়ার ওয়াদায় বিয়ে করেছে, কিন্তু দেনমোহর দেওয়ার ইচ্ছে নেই, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট ব্যাভিচারী হিসেবে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।”
পবিত্র কুরআনের আয়াত ও হাদিসের আলোকে বলা যায়, আল্লাহর নির্দেশেই স্ত্রীর দেনমোহর দিতে হয় এবং বিয়ের সময়ই স্ত্রীকে দেনমোহর পরিশোধ করার বিধান রয়েছে । স্বামী তার আর্থিক সঙ্গতি অনুযায়ী মোহর দেবে। স্ত্রী মোহর হিসেবে প্রাপ্ত সম্পত্তির মালিক হয়েই স্বামীর সঙ্গে সংসারযাত্রা শুরু করবে। স্বামী কর্তৃক প্রাপ্ত এই সম্পদ একান্তভাবে স্ত্রীর। এখানে অন্য কারো কোনো অধিকার নেই। স্ত্রী ইচ্ছে করলে প্রাপ্ত মোহর থেকে স্বামীকে কিছু অংশ দিতে পারে বা অন্য কাউকে কিছু দান করতে পারে, এটা স্ত্রীর ব্যক্তিগত অধিকার এবং স্বাধীন ইচ্ছা।
দেনমোহর ও প্রচলিত আইন
মুসলিম আইনের উৎস হলো পবিত্র কুরআন, হাদিস, ইজমা, কিয়াস। আর বাংলাদেশের মুসলমানদের উত্তরাধিকার, বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব ও দেনমোহর ইত্যাদি সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ হয় মুসলিম আইনের মাধ্যমে। দেনমোহরের বিষয়ে ‘‘মুসলিম আইনের’’ ২৮৫-৩০৬ ধারায় বিস্তারিত বলা হয়েছে, এছাড়াও মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ১০ ধারায় দেনমোহরের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। মুসলিম আইনের ২৮৫ ধারা অনুযায়ী দেনমোহর হল “কিছু টাকা অথবা অন্য কোনো সম্পত্তি যা বিবাহের প্রতিদানে স্ত্রী, স্বামীর নিকট হতে পাওয়ার অধিকারী হয়।’’
মুসলিম পারিবারিক আইন
অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ১০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘যেক্ষেত্রে দেনমোহরের টাকা পরিশোধের পন্থা কাবিননামায় অথবা বিবাহের চুক্তিতে বিস্তারিতভাবে নির্দিষ্ট করা হয় নাই সেক্ষেত্রে দেনমোহরের মোট পরিমানই তলবমাত্র পরিশোধযোগ্য বলিয়া ধরিয়া লওয়া হইবে।’’ বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, দেনমোহর প্রদানে স্বামী বাধ্য ও স্ত্রী আইনানুসারে দেনমোহর আদায় করতে পারে।
দেনমোহর নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা
দেনমোহর প্রদান ও পরিশোধের ব্যাপারে বাংলাদেশে অনেক ভ্রান্ত ও চরম ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় কিংবা আগে তালাকের নোটিশ বা তালাক দেয়, তাহলে দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে না। এছাড়াও স্ত্রীর ভরণ-পোষণসহ যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করলে আর দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে না। অনেক স্বামী স্ত্রীকে দামী কিছু উপহার দিলে মনে করেন যে, দেনমোহর পরিশোধ হয়ে গেছে। অনেক স্বামী তার স্ত্রীর দেনমোহর আদায় না করা অবস্থায় মারা গেলে আত্মীয়-পড়শীরা এসে স্বামীর মৃতদেহ খাটিয়ায় উঠানোর আগে স্ত্রীর কাছে মোহরানার দাবি মাফ চাইলে দেনমোহর মাফ ও পরিশোধ হয়ে যাবে। আবার শুধুমাত্র দেনমোহরের টাকা স্ত্রীকে দিতে হয় শুধুমাত্র স্বামী বিয়ের বিচ্ছেদ ঘটালে। এমন ভ্রান্ত ও ভূল ধারনা প্রচলিত থাকলেও এই সবগুলো ধারণাই সঠিক না। এগুলো অজ্ঞতা ও চরম ভুল। দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করা ফরজ।
দেনমোহর স্ত্রীর হক যা অবশ্যই স্বামীকে প্রদান করতে হবে এবং খুশি মনে প্রদান করতে হবে। এটা স্ত্রীর প্রতি কোন দয়া বা দান নয় বরং স্ত্রীর পাওনা। দেনমোহর মূলত দেয়া হয় স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তার জন্য। মুসলিম আইনের ভাষ্য হচ্ছে-দেনমোহর এমনভাবে প্রদান করতে হবে যাতে সেটির উপর স্ত্রীর নিঃশর্ত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্ত্রী নিজ ইচ্ছামতো বিনা বাধায় তা ব্যবহার, খরচ, দান, ভোগ বা ঋণ দিতে পারে। যেহেতু দেনমোহর সর্বাবস্থায় স্বামীর ঋণ, তাই দেনমোহর পরিশোধ করতে স্বামী ধর্মীয় ও আইনের বিধান অনুযায়ী বাধ্য।
এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পর দেনমোহর স্ত্রীর কাছে স্বামীর ঋণ হিসেবে ধরা হবে। অন্যান্য ঋণের মতোই এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। দাফন-কাফনের খরচ করার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি থেকে দেনমোহর ও অন্যান্য ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
এছাড়াও স্ত্রী তাহার দেনমোহরের টাকা না পাইলে, সে এবং তাহার মৃত্যর পর তাহার উত্তরাধিকারীগণ উহার জন্য মামলা দায়ের করিতে পারে।
এমনকি এই ঋণ পরিশোধ না করলে স্ত্রী স্বামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে দেনমোহরের জন্য মামলাও করতে পারে। স্বামীর আগে স্ত্রীর মুত্যু হলেও দেনমোহর দিতে হবে। এক্ষেত্রে স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা এই দেনমোহর পাবার অধিকারী। তারা দেনমোহর পাবার জন্য মামলাও করতে পারে। এছাড়া স্ত্রী দেনমোহর পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত তার স্বামীর অন্যান্য ওয়ারেশদের এবং তার স্বামীর পাওনাদারদের বিরুদ্ধ জনিত দখল বজায় রাখতে পারবে।
এছাড়াও ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ-বিচ্ছেদ আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘অত্র আইনে সন্নিবেশিত কোনো কিছুই কোনো বিবাহিত মহিলার বিবাহ-বিচ্ছেদের ফলে মুসলিম আইন অনুযায়ী তার প্রাপ্য দেনমোহর অথবা তার কোনো অংশের ওপর তার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করবে না।’’
এদিকে, ডা. আব্দুল বনাম রোকেয়া (২১ ডিএলআর, ২১৩) মামলায় উচ্চ আদালত বলেন, ‘‘বিয়ে রেজিষ্ট্রি হোক বা না হোক স্ত্রী দেনমোহর পেতে অধিকারিণী। তবে অরেজিষ্ট্রিকৃত বিয়ে বিয়ের বৈধতা সম্পর্কে সন্দেহের সৃষ্টি করে।’’
দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে, এর বিকল্প কোন ব্যবস্থা নেই। ধর্মীয় অনুশাসন ও আইনে এর ব্যতয় ঘটানোর কোন সুযোগ নেই।
আদালতে মামলা
স্বামী যদি দেনমোহর পরিশোধ না করে তবে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে এবং তাহার অধিকার বলে প্রাপ্ত দেনমোহর আদালতের মাধ্যমে আদায় করতে পারে।
লেখক: সংবাদকর্মী ও আইনজীবী








