ডিজিটাল ডিটক্স সত্যিই কাজ করে, নাকি এটাও নতুন ট্রেন্ড?

ছবি: সংগৃহীত
সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন। রাতে ঘুমানোর আগে ফোন। মাঝখানে কাজের ফাঁকে ফোন, খাওয়ার সময় ফোন, এমনকি কারও সঙ্গে গল্প করতে করতেও ফোন! একসময় মনে হয়, ফোনটা আমরা ব্যবহার করছি, নাকি ফোনই আমাদের ব্যবহার করছে?
এই জায়গা থেকেই জনপ্রিয় হয়েছে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ কিছু সময়ের জন্য ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস থেকে নিজেকে দূরে রাখা। কেউ এক দিনের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রাখছেন, কেউ সপ্তাহে একটি ‘নো ফোন ডে’ পালন করছেন, আবার কেউ ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে রাখার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল ডিটক্স কি সত্যিই মানসিকভাবে উপকার করে, নাকি এটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি জনপ্রিয় ট্রেন্ড? ফোনটা কাছে থাকলেই মন কেন অস্থির হয়?
স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি এখন আমাদের বিনোদন, খবর, কাজ, কেনাকাটা, সম্পর্ক সবকিছুর সঙ্গী। ফলে বারবার ফোন দেখার অভ্যাস তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
নোটিফিকেশন, নতুন মেসেজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন কোনো আপডেট এসব আমাদের মস্তিষ্ককে বারবার ফোনের দিকে ফিরিয়ে নিতে পারে। এমনকি কোনো নোটিফিকেশন না থাকলেও অনেকেই অভ্যাসবশত ফোনের স্ক্রিন খুলে ফেলেন। অর্থাৎ, অনেক সময় ফোন দেখার প্রয়োজন নেই শুধু অভ্যাসটাই যথেষ্ট।
ডিটক্স মানেই ফোন ছুড়ে ফেলা নয়
ডিজিটাল ডিটক্স শুনলেই মনে হতে পারে, সাত দিনের জন্য ফোন বন্ধ করে পাহাড়ে চলে যেতে হবে! বাস্তবে বিষয়টি এত কঠিন হওয়ার দরকার নেই।
বরং নিজের ডিজিটাল ব্যবহারে কিছু সীমা তৈরি করাই হতে পারে সহজ শুরু। যেমন ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম ৩০ মিনিট ফোন না দেখা, খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা কিংবা ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট সময় স্ক্রিন বন্ধ রাখা।
লক্ষ্য ফোনকে জীবনের শত্রু বানানো নয়; বরং ফোন যেন জীবনের নিয়ন্ত্রক না হয়ে ওঠে, সেটাই মূল কথা।
তাহলে সত্যিই কি উপকার হয়?
অনেকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কমালে মনোযোগ, ঘুমের রুটিন এবং দৈনন্দিন কাজে উপস্থিত থাকার অনুভূতি ভালো হতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারণে যদি নিজের জীবনকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার অভ্যাস তৈরি হয়, তাহলে কিছুটা বিরতি মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করতে পারে।
তবে ডিজিটাল ডিটক্স কোনো জাদুর সমাধান নয়। সারাদিন ফোন ব্যবহার করে সপ্তাহে এক দিন ফোন বন্ধ রাখলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বিষয়টি এমন নয়।
বরং কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করছি, কী কাজে ব্যবহার করছি এবং কেন বারবার ফোন হাতে নিচ্ছি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ডিটক্সের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা মাত্র পাঁচ মিনিট
ডিজিটাল ডিটক্সের আসল পরীক্ষা শুরু হয় তখনই, যখন আমরা নিজেদের বলি, শুধু পাঁচ মিনিট ফোন দেখব।
তারপর একটি ভিডিও। তারপর আরেকটি। এরপর বন্ধুর স্টোরি। সেখান থেকে অন্য কারও প্রোফাইল। তারপর হঠাৎ দেখা গেল, পাঁচ মিনিটের জায়গায় ৪৫ মিনিট চলে গেছে!
এই অভ্যাস ভাঙতে তাই শুধু ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর না করে পরিবেশটাও বদলানো যায়। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করা, ঘুমের সময় ফোন বিছানা থেকে দূরে রাখা কিংবা নির্দিষ্ট অ্যাপের ব্যবহার সীমিত করা ছোট পদক্ষেপ হলেও কাজে আসতে পারে।
ডিজিটাল ডিটক্সের আসল অর্থ
ডিজিটাল ডিটক্স আসলে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়। বরং প্রযুক্তির সঙ্গে নিজের সম্পর্কটা একটু সচেতনভাবে দেখা।
ফোন দরকার ব্যবহার করুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দরকার ব্যবহার করুন। কিন্তু যদি বুঝতে পারেন, প্রয়োজন না থাকলেও বারবার স্ক্রিন খুলছেন, কাজের মাঝেও মন চলে যাচ্ছে নোটিফিকেশনের দিকে, কিংবা ফোন ছাড়া কয়েক মিনিট থাকতেই অস্বস্তি হচ্ছে তাহলে হয়তো একটু বিরতি নেওয়ার সময় এসেছে।
কারণ শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল ডিটক্স কোনো ফ্যাশন নয়, নিজের সময় ও মনোযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার একটি চেষ্টা।
আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ডিটক্স শুরু করার জন্য নতুন কোনো অ্যাপও দরকার নেই। কখনো কখনো শুধু ফোনটা উল্টো করে টেবিলে রাখাই প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।
ফারজিয়া






