ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) বাংলাদেশের আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেছে, আগামী ৭ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। যা দেশের অভ্যন্তরে একটি রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে দুই পক্ষকেই সংলাপে বসতে হবে।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিজি আজ বৃহস্পতিবার ৪ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘বিয়ন্ড দ্য ইলেকশন: ব্রেকিং বাংলাদেশ’স পলিটিক্যাল ডেডলক’ শীর্ষক ৪৭ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে এই কথা বলেছে।
আইসিজি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, এবারের নির্বাচনে বিরোধীদের অনেকেই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। বিরোধীদের নির্বাচন বর্জন মানে ভোটার উপস্থিতি সম্ভবত কম হতে যাচ্ছে। ব্যালটে তেমন বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প না থাকায় অসন্তুষ্ট বাংলাদেশিরা রাজপথে নামছে এবং রাজনৈতিক সহিংসতার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যেও দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখা দিতে পারে।
আইসিজি মনে করছে, যদিও জানুয়ারির নির্বাচন পিছিয়ে দিতে এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের উচিত ভোটের পর উভয়পক্ষ থেকে ছাড়ের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে কাজ করা। বিদেশি অংশীদারদের উচিত তাদের এই লক্ষ্যে উৎসাহিত করা।
৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি মারাত্মক অচলাবস্থার মধ্যে আটকা পড়েছে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার এবং বিরোধী দল বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং নির্বাচন তদারকির জন্য একটি তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান সরকার প্রত্যাখ্যান করার পর বর্তমান সরকারের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও তার মিত্ররা ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে।
যদিও এখন ভোট স্থগিত করতে অনেক দেরি হয়ে গেছে, সংকটের সমাধান এবং আরও অস্থিতিশীলতা রোধ করার লক্ষ্যে সরকার ও বিরোধীদের উচিত ভোটের পর আলোচনা শুরু করা।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সবচেয়ে দীর্ঘকালীন প্রশাসনে পরিণত হয়েছে। এমনকি ১৯৮০’র দশকের সামরিক শাসনকেও ছাড়িয়ে গেছে। দেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে পাওয়া উত্তরাধিকার এবং একটি শক্তিশালী দলীয় কাঠামো থাকায় তিনি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে তার সাফল্য গড়ে তুলেছিলেন। তার সরকার এক দশকেরও বেশি সময় শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নত স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তার তদারকিতে নিরাপত্তা বাহিনী ২০০০-এর দশকে উত্থান হওয়া জিহাদি গোষ্ঠীগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে। পুরোনো মিত্র ভারতসহ বিদেশি সমর্থন, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও, যারা “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে” আওয়ামী লীগকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে এবং ২০১৭ সালে মিয়ানমারে দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গ্রহণে তাদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়। এ বিষয়গুলোও শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল ২০১১ সালের সংবিধানের সংশোধনীগুলো। এর মাধ্যমে ভোটের আগে তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসনকে পথ করে দিতে নির্বাচিত দলীয় সরকারগুলোকে সরে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয় বিধানগুলো বাদ দেওয়া হয়েছিল। এই সংশোধনীর কারণে বিরোধী দল ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে এবং ২০১৮ সালের ভোটে অংশ নেওয়ার সময় তারা কর্তৃপক্ষের হাতে ক্রমাগত দমন-পীড়নের সম্মুখীন হয় বলেও অভিযোগ তোলে।
আইসিজি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। আর সম্ভাব্য সহিংস প্রতিক্রিয়াসহ আওয়ামী লীগের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে দুই পক্ষকে সংলাপে বসতে হবে। প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং বাংলাদেশকে গণতন্ত্র, শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনতে আলোচনার জন্য উভয়পক্ষ থেকে ছাড় প্রয়োজন। দেশটির বিদেশি অংশীদারদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের উচিত তাদের সেই দিকে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করা।








