২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঘটিত পিলখানা হত্যাকাণ্ডে প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তির দাবি জানিয়েছে শহীদ পরিবারের সদস্যরা। পাশাপাশি এই দিনটিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ ঘোষণারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বুধবার (২৯ জানুয়ারি) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি জানানো হয়।
সেই দিনের ঘটনা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংগঠিত হয় পৃথিবীর ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ ও ভয়াবহ ম্যাসাকার। সেদিন নির্মমভাবে হত্যা করা হয় কর্তব্যরত নিরস্ত্র নিরপরাধ ৫৭ বিডিআর অফিসার তথা সেনা কর্মকর্তাকে, লাশ বিকৃত করা হয়, লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ট্রাকে লোড করা হয়, পৈশাশিকভাবে লাশকে ক্ষতবিক্ষত করে গণ-মাটি চাপা দেওয়া হয়, ড্রেনে ফেলে দেওয়া হয় ও গুম করা হয়, পৈশাশিকভাবে অফিসারের পরিবারকে হত্যা ও নির্যাতন করা হয়, সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে নিরীহ নিরপরাধ নারী ও শিশুদের টেনে হেচড়ে চরম নির্যাতন এর মাধ্যমে ধরে এনে কোয়াটার গার্ডে বন্ধী করা হয়, ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া বেশির ভাগ অফিসারকেই শারীরিকভাবে চরম নির্যাতন করা হয়, অফিসারদের বাস-স্থানে ব্যাপক ভাংচুর অগ্নিসংযোগ চুরি ডাকাতি করা হয়, অফিসারদের গাড়ি ভাংচুর ও আগ্নিসংযোগ করা হয়, ব্যাক্তি ও সরকারি সম্পতির ব্যাপক ধ্বংস এর মাধ্যমে পিলখানাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়।
বিপথগামী বিডিআর জোয়ান কর্তৃক ২৫ ফেব্রুয়ারি সংগঠিত উক্ত অপরাধের চাক্ষুষ সাক্ষী আমরা শহীদ পরিবার, বেঁচে ফেরা আফিসারগণ এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে সারা পৃথিবী অবলকোন করেছে।
সেদিন পিলখানায় প্রায় ৫ হাজার বি ডি আর সদস্য এবং ৪ হাজারের মতো অস্ত্র মজুদ ছিল, বিডিআর জওয়ানরা আধা ঘণ্টার মধ্য অস্ত্রাগার লুট করে সকল অস্ত্র বের করে নেয় এবং সরাসরি কার্নেজে ব্যবহার করে। সেদিন শুধুমাত্র পিলখানায় বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছে তা নয়, বিপথগামী বি ডি আর সৈনিক কর্তৃক উস্কানির মাধ্যমে সারা দেশের রাইফেল ব্যটালিয়ান ও ট্রেনিং সেন্টারে বিদ্রোহ সংগঠিত হয়।
এতে বলা হয়, কার্নেজে পরবর্তী তৎকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত আনিসুজ্জামান তদন্ত কমিশন, সেনাবাহিনী কর্তৃক গঠিত সেনা তদন্ত, সি আই ডি তদন্ত এবং বি ডি আর ইউনিট তদন্তে রাজনৈতিক কারণে পেছনের ষড়যন্ত্রকারীরা বেরিয়ে আসেনি, তবে তাদের তদন্তে বিপথগামী বি ডি আর জওয়ানদের সরাসরি অংশগ্রহনে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির ম্যসাকার সংগঠিত হওয়ার বিষয়টি সন্দেহাতিতভাবে প্রমানিত হয়। পর্যাপ্ত প্রমাণ এবং শহীদ ও বেচেঁ ফেরা অফিসারদের সাক্ষীর ভিত্তিতে সিভিল কোর্ট ও বি ডি আর কোর্টে বিপথগামি জওয়ানদের দোষী সাব্যস্ত করে সাজা প্রদান করা হয়। সিভিল আদালতে হত্যা ও অস্ত্র-গোলাবারুদ এর মামলা পরিচালনা করা হয়।
যথাযথ বিধি অনুসরনে এবং অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে বি ডি আর অর্ডিন্যান্স এর আওতায় বি ডি আর কোর্টে বিদ্রোহের মামলায় জওয়ানদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। বি ডি আর কোর্টের সাজা নিয়ে প্রশ্ন করা মানে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর অফিসারদের তথা সেনাবাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। অতএব অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত বিপথগামি জওয়ানদের নিরপরাধ বলার কোন সুযোগ নেই এবং তাদের মুক্তির দাবি সম্পূর্ণ অযোক্তিক। তাই আমাদের একান্ত দাবি, সাজাপ্রাপ্ত অপরাধিদের প্রাপ্য সাজা অবিলম্বে কার্যকরের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতঃ বাহিনিটিকে কলঙ্ক মুক্ত করা হউক। সঠিক বিচার না হলে ভবিষ্যতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
৫ আগস্ট পরবর্তী নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবী বি ডি আর মামলায় সম্পূর্ণ নতুন। এত বড় ঘটনার বিস্তারিত জানার জন্য তাদের পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন। বর্তমানে চলমান মামলা পরিচালনার জন্য সরকার কর্তৃক প্রয়োজনীয় সংখক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আইনজীবী নিয়োগ এর মাধ্যমে যথাযথ আইনি লড়াই চালু রাখা এবং এর মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের যথাযথ শাস্তি প্রদানে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে একান্ত অনুরোধ জানাচ্ছি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, বি ডি আর কার্নেজে অভিযুক্ত/ সাজাপ্রাপ্ত সৈনিক ও তদের পরিবার গত ১৫ বছর কোন দাবি নিয়ে মাঠে আসতে আমরা দেখিনি, কিন্তু আজ তারা সম্পূর্ন অযৌক্তিক দাবি নিয়ে বিপথগামি সৈনিকদের নিরাপরাধ দাবির আন্দোলন, এর মাধ্যমে জাতিকে ব্রিভ্রান্ত করে বিচার হীনতার সংস্কৃতি চালু করার অপচেষ্টা করছে বলে প্রতিয়মান। তাদের এই দাবির মাধ্যমে জাতির দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে প্রকৃত খুনিদের আড়ালের মাধ্যমে বর্তমানের ছাত্র-জনতার সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার আপচেষ্টা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সেনা অফিসার ও সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপপ্রয়াস বলে প্রতিয়মান। এই খুনিদের যথাযথ বিচার না হলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে, যা মোটেও কাম্য হতে পারে না।
বি ডি আর ম্যাসাকার এর পিছনে দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্র জড়িত আছে বলে জাতি বিশ্বাস করে, যা বর্তমান সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিশন এর অধিকতর তদন্তে বেরিয়ে আসবে এটাই জাতির প্রত্যাশা। বি ডি আর ম্যাসাকার এর পিছনের পরিকল্পনাকারী, মদদ দাতা ও সহায়তাকারীদের চিহ্নিত করে স্পেশাল ট্রাইবুনাল এর মাধ্যমে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমেই দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার জোর দাবি জানাচ্ছি। প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থানরত দোষী ব্যক্তিদের দেশে এনে বিচার সম্পন্ন করতে হবে।
পৃথিবীর ইতিহাসে এক দিনে ৫৭ জন বি ডি আর তথা সেনা আফিসার হত্যার নজীর নাই। তাই ২৫ ফেব্রুয়ারি জাতিয় শহীদ সেনা দিবস ঘোষণার জন্য শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।







