একটা সময় ছিল যখন দৈনন্দিন কাজে ঘরে ঘরে বাসন-কোসন বলতে ছিল কাসাঁ, পিতল ও তামার তৈজসপত্র। মাঝে সময়টা অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও মেলামাইনের। এসময়টাতে পূজা অর্চনা কিংবা বিবাহ অনুষ্ঠানের ব্যবহৃত হচ্ছিল কাসাঁ, পিতল ও তামার তৈজসপত্র। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতি যেমন পরিবর্তন এনেছে ঠিক তেমনই এর প্রভাব পড়েছে গৃহস্থলির তৈজসপত্রে। মানুষ আবারও ফিরছে কাসাঁ, পিতল ও তামার তৈজসপত্রে।
বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের উপহার হিসেবে মানুষের নতুন আগ্রহের কেন্দ্র এখন কাঁসা-পিতলের বিভিন্ন শোপিস। আভিজাত্য প্রকাশে এসব শোপিস দিয়ে ঘর সাজাতেও পছন্দ করেন কেউ কেউ।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে: দৈনন্দিন ব্যবহার্য পিতল ও কাঁসার বাসন-কোসন, হাঁড়ি-পাতিল, গ্লাস-প্লেট, পানির জগ, বোল-বাটির পাশাপাশি আরও রয়েছে কুপিবাতি, হুঁকা, সুরমাদানি, পানদানি, লবণদানি, বদনা, ছেনি, ট্রে, কলস, টিফিন ক্যারিয়ার মতো সামগ্রী।

এছাড়া, গৃহসজ্জা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ফুলদানি, উইন্ড চাইম, গ্রামোফোন, ফটোফ্রেম, দাবার ছকসহ বিভিন্ন শোপিস এবং তার সঙ্গে ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে নানা সামগ্রী।
কাঁসা-পিতল ও তামার তৈজসপত্রের মূল বাজার রাজধানীর শাঁখারি বাজার, বাংলা বাজার, মিটফোর্ড এবং এলিফ্যান্ট রোড। শাঁখারি বাজারে গিয়ে দেখা গেল দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বেশ চোখে পড়ার মতো। কেরাণীগঞ্জ থেকে এসেছেন আব্বাস আলী দম্পতি, ৩ হাজার টাকায় কিনেছেন পিতলের একটি বড় গামলা (বাটি) এবং থালা। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন সীথি সাহা, পূজার জন্য কিনবেন আগরদানি। বিয়ের হলুদ অনুষ্ঠানের জন্য পিতলের কলস কিনতে এসেছেন কবির হোসেন।
আব্বাস আলী জানালেন: আগে মেলামাইনের তৈজসপত্র ব্যবহার করতাম। করোনাভাইরাসের পর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাসায় আর কোন ধরনের প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করব না। এরপর থেকে বাসায় পিতলের বাসন-কোসন ব্যবহার করছি। নতুন করে প্রয়োজন হওয়ায় আজ একটি গামলা ও থালা কিনলাম।
৩০ বছরের বেশি সময় থেকে কাঁসা-পিতল-তামার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ধামরাই বাসনালয়ের স্বত্বাধিকারী আতোয়ার রহমান। তিনি বলেন: আমার ব্যবসার শুরু ১৯৮৯ সালে। তখন পিতল, তামা ও কাঁসার দাম কম ছিল। পিতলের সের ছিল মাত্র ৬০ টাকা। কাঁসা ১১০ টাকা। তামা ৭০ থেকে ৮০ টাকা। আর এখন পিতলের কেজি এক হাজার থেকে ১২০০ টাকা। কাঁসা দুই হাজার ২০০ টাকা। তামা এক হাজার ৫০০ টাকা। উচ্চমূল্যের কারণে অনেক গ্রাহক অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও মেলামাইনে ঝুঁকেছে বলে মন্তব্য তার।

তিনি আরও জানান: আগে কাঁসার ভাঙারি পাওয়া যেতো ২০০-৩০০ টাকার মধ্যে। আর এখন এই ভাঙারির দাম ১৫০০ টাকা। তাও কাঁচামাল খুঁজে পাওয়া যায় না খুব সহজে। তাই পুরোনো কাঁসা ভেঙে পুনরায় নতুন করে বাসন-কোসন ও অন্যান্য জিনিস বানানো হয়। পুরনো কাঁসার ভাঙারি পাওয়া যায় নয়াবাজার ব্রিজের পাশের বাজারে। ওখান থেকেই আমরা কিনে এনে সেগুলো গলিয়ে বাসন-কোসন তৈরি করি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে: ভাঙা পিতল (কাঁচাপণ্য) মান ভেদে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে কেনাবেচা হয়। সেগুলো কারখানায় এসে কারিগরের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় বিভিন্ন তৈজসপত্র এবং শোপিসের রূপ পায়। সেগুলো আবার কেজি হিসেবে দাম নির্ধারণ করা হয়। পিতলের কলস ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি। সেই হিসাবে কলসের যতটুকু ওজন হবে সেটার সঙ্গে প্রতিকেজির দাম গুণ দিয়ে দাম নির্ধারণ হবে। এছাড়া ইঞ্চি হিসেবেও বিক্রি হয়।
চন্দ্র নাম স্টোরে গিয়ে দেখা গেলো ভারত থেকে আমদানি করা পূজা সামগ্রী বেশি সেখানে। সামনে দুর্গাপূজা তাই বেচা বিক্রিও ভালো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে পণ্য সংগ্রহ করে থাকেন। সেখানে বিক্রি হচ্ছে, পূজার সামগ্রী ঘণ্টা, এক প্রদীপ, ঘটি, কলস, সিঁদুর কৌটা, গ্লাস, থালা, ডাব, কুলা, কর্পূর প্রদীপ ও কলাপাতাসহ পিতলের তৈরি নানা সামগ্রী।
কেমন দামে কিনতে পারবেন কাঁসা-পিতল ও তামার তৈজসপত্র ও শোপিস
কাঁসা, পিতল, তামার তৈজস বিক্রি হয় কেজি দরে। কাঁসার দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। পিতল ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ আর তামার তৈজসপত্র পাওয়া যায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা কেজি দরে। ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম পিতলের কলস ৮ ইঞ্চি ১০০০ টাকা, ১০ ইঞ্চি ১২০০ এবং ১২ ইঞ্চি ১৫০০ টাকা। থালা ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা। বাটি ৪ থেকে ১০ ইঞ্চি ২০০ থেকে ২০০০ টাকা। চামচ ছোট ৩০০ এবং বড় ৪০০ টাকা। জগ ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকা।
এ ছাড়া তামার তৈরি ফুলদানি ১০০০ থেকে ১২ হাজার টাকা, ফুলের টব ১ হাজার থেকে ১৫ হাজার, টবের স্ট্যান্ড ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০, বাতির শেড ১৫ হাজার, কলস (হালকা নকশা) ১ হাজার থেকে ৪ হাজার, কলস (ভারী নকশা) ১ হাজার ৫০০ থেকে ৮ হাজার টাকা।







