এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
সড়ক নিরাপত্তায় সংস্কারের জন্য একটি আলাদা সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তারা এ দাবি জানান। এর আগে আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক সংবাদ সম্মেলন করেন তারা।
সিআইপিআরবি- এর রোড সেফটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক কাজী বোরহান উদ্দিন এর সঞ্চালনায় উক্ত অনুষ্ঠানে কোয়ালিশনের সদস্য সংস্থার প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নিরাপদ সড়ক চাই এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন, সিআইপিআরবি পরিচালক সেলিম মাহমুদ চৌধুরী এবং ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার এম খালিদ মাহমুদসহ অন্যরা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবহন সংক্রান্ত বাংলাদেশের প্রথম আইন হচ্ছে ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ। এই অর্ডিনেন্সে তথা অধ্যাদেশে সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো বিষয়ের ঘাটতি ছিল। ফলে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে নানাবিধ আইনি জটিলতা তৈরী হচ্ছিল। বিষয়টি সমাধানের উদ্দেশ্য সরকারের নীতি নির্ধারকগণ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সকলে মিলে ২০১২ সালে একটি আইনের খসড়া প্রণয়ন করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে সরকার ও সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অংশীজন মিলে ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন’ নামে একটি আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে। তবে আইনের খসড়া চ‚ড়ান্ত হলেও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতায় তখন সেটি পাশ করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ঢাকার শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুইজন শিক্ষার্থী নিহত এবং ১২ জন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনার প্রেক্ষিতে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে মোটরযান অধ্যাদেশ,১৯৮৩ রহিত করার মাধ্যমে ২০১৬ সালে প্রস্তুতকৃত ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন’ নামক খসড়াটিকে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসের ৮ তারিখে ‘সড়ক পরিবহন আইন- ২০১৮’ নামে প্রণয়ন করা হয়। সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অংশসমূহ বাদ দিয়ে ২০১৮ সালে আইনটি প্রণয়ন করা হলেও যথাসময়ে বিধিমালা জারি না হওয়ায় আইনটির প্রয়োগ বন্ধ ছিল। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ বিধিমালা জারির জন্য সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে এবং জোরালো দাবি উত্থাপন করার প্রেক্ষিতে সরকার ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর তারিখে ‘সড়ক পরিবহন বিধিমালা- ২০২২’ জারি করে। জারিকৃত বিধিমালায় সড়ক নিরাপত্তার আচরণগত ঝুঁকির বিষয়গুলি সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখ থাকায় সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশে মানুষের নিহত ও আহত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ রোডক্র্যাশ বা সড়ক দুর্ঘটনা, যা প্রকারান্তরে অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যখাতে বিশাল চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। বিআরটিএর হিসাবমতে প্রতিবছর দেশে গড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ নিহত এবং ১০ হাজারের বেশী বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয় এবং পঙ্গুত্ব বরণ করে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বেশী (আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জন) এবং এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজ ক্রমাগত সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি হয়নি।
জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার প্রাণের বিনিময়ে আমরা যে গণতান্ত্রিক মুক্তি, নতুনভাবে পথচলার শক্তি পেয়েছি তার চেতনা আমাদের অন্তরে লালন করতে হবে, প্রতিফলিত করতে হবে রাষ্ট্রের সকল স্তরে। ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর যখন পুলিশবিহীন রাস্তায় কোন শৃঙ্খলা ছিল না, তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরুণ সদস্যরা সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আমাদেরকে আশার আলো দেখিয়েছে। তাই সড়ক নিরাপত্তায় সংস্কার ভাবনা এখন সময়ের দাবী।
আপনারা জানেন যে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনটিই সড়ক সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ আইন। বিশ্বব্যাপী সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম পরিলক্ষিত হলেও বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টি তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে। কেননা, সড়ক নিরাপত্তা ২০২১-২০৩০ এর জন্য কর্মের দশক ও আন্তর্জাতিক বেস্ট প্রেকটিস এর সাথে পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের প্রচলিত সড়ক পরিবহন আইন- ২০১৮ এ বেশকিছু সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়।
সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
বর্তমান আইনটিতে মূলত পরিবহন ব্যবস্থার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যাতে প্রচলিত সড়ক ব্যবহারকারীর আচরণগত ঝুঁকিসমূহের (বেপরোয়া গতি, হেলমেট ব্যবহার না করা, মদ্যপ বা নেশাগ্রস্থ অবস্থায় গাড়ী চালানো, সিটবেল্ট/ চাইল্ড রেস্ট্রিয়েন্ট ব্যবহার না করা ইত্যাদি) বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

সড়ক নিরাপত্তার জন্য জাতিসংঘ ঘোষিত সড়ক নিরাপত্তা ২০২১-২০৩০ এর জন্য কর্মের দশকে যে পাঁচটি বিষয়ে (১. মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট বা বহুমুখি পরিবহন ব্যবস্থা ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, ২. নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, ৩. নিরাপদ যানবাহন, ৪. নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং ৫. রোডক্র্যাশ পরবর্তী সাড়া প্রদান ও ব্যবস্থাপনা) গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ও সুপারিশ করা হয়েছে, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে এসকল বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। বর্তমান আইনে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারী যেমন: পথচারী, সাইক্লিস্ট, শিশু এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন/ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত।
যথাযথ মানদণ্ড অনুসরণ করে রোড ক্র্যাশের তদন্ত করা এবং রেকর্ড সংরক্ষণ করার বিষয়ে বর্তমান আইনি কাঠামোতে কোন বিধান রাখা হয়নি।
উল্লেখ্য, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা একটি মন্ত্রণালয় কিংবা একটি দপ্তরের একার কাজ নয়। এতে অনেকগুলো মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের সক্রিয় অংশগ্রহণ যেমন দরকার তেমনি প্রয়োজন লিড এজেন্সি নির্ধারণ করা, যা আইনী কাঠামোর দ্বারা স্বীকৃত হতে হবে। বর্তমান আইনি কাঠামোতে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কোন লিড এজেন্সি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই।
সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বর্তমান বাস্তবতার আলোকে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিম্নোক্ত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়:
জাতিসংঘ ঘোষিত সড়ক নিরাপত্তা ০২১-২০৩০ এর জন্য কর্মের দশক- এ উল্লেখিত বিষয়সমূহ (বিশেষতঃ নিরাপদ সিস্টেম পদ্ধতি) অন্তর্ভুক্ত করার আলোকে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ণ করা। যার মাধ্যমে নিম্নেলিখিত বিষয়সমূহ নিশ্চিত হবে:
সড়ক ব্যবহারকারীদের জীবনের নিরাপত্তা; রোডক্র্যাশ জনিত মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হার হ্রাস; টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩.৬ ও ১১.২ অর্জন; রোডক্র্যাশ হ্রাসের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচন ও পরিবেশের উন্নয়ন।








