ওমানে আসছে ২৩মে থেকে ১ জুন বসবে জুনিয়র হকি (অনূর্ধ্ব-২১) এশিয়া কাপের আসর। সেমিফাইনালে উঠতে পারলেই দেশের জন্য হকি বয়ে আনবে বড় সুখবর। শেষ চারে খেলার সুযোগ মিললে পাওয়া যাবে জুনিয়র বিশ্বকাপে খেলার টিকিটও।
এবারের আসরে অংশ নেবে ১০ দেশ। এখনও গ্রুপিং ড্র হয়নি। অংশ নিতে চলা দলগুলো- বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সাউথ কোরিয়া, জাপান, ওমান, উজবেকিস্তান, চাইনিজ তাইপে এবং থাইল্যান্ড। যাদের মধ্যে ৪ দেশ বিশ্বকাপে খেলার ছাড়পত্র পাবে।
জুনিয়র বিশ্বকাপে বাংলাদেশ আগে কখনোই খেলেনি। এবার আশা পূর্ণ হবে, আশাবাদী লাল-সবুজ দলের খেলোয়াড় দেবাশীষ কুমার রায়। ঊষা ক্রীড়াচক্রে খেলা ১৯ বর্ষী স্ট্রাইকার হকি বিশ্বকাপে খেলার প্রত্যাশার কথা জানালেন চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপচারিতায়।
‘ওমানে জুনিয়র এশিয়া কাপ আছে। এটা আমাদের পুরো বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় আশাদায়ক টুর্নামেন্ট। আমরা যখন এএইচএফ কাপ খেলতে যাই, তখন শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ছিল ওমান। যেহেতু ওমানকে সেই টুর্নামেন্টে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে এসেছি, এখন যে মিশনটা সামনে আছে, সেটা জুনিয়র বিশ্বকাপ খেলার বিষয়।’

‘এশিয়া কাপে সেরা চারে থাকতে পারলে আমরা বিশ্বকাপে খেলতে পারব। এটা আমাদের জন্য খুব একটা কঠিন কিছু না। মানুষ চেষ্টা করলে পারে না এমন কিছু নেই। এখানে ভারত, পাকিস্তান আছে। মালয়েশিয়া আছে, সাউথ কোরিয়া আছে, ওমান থাকবে। আমরা যেহেতু ওমানকে একবার হারিয়েছি, সেই বিষয়টা হাতে রেখে বাকি যে শক্তিশালী দলগুলো আছে, তার মধ্যে দুইটাকে হারানোর চেষ্টা করি, তাহলে টুর্নামেন্টে আমরা ভালো করতে পারব। বিশ্বকাপে উত্তীর্ণ হতে পারব।’
‘বাংলাদেশ যদি একবার বিশ্বকাপে যেতে পারে, দেশের প্রতিটি কানায় কানায় এখন যেরকম ক্রিকেট-ফুটবল আছে, তখন এসবের পাশাপাশি হকি নামেরও একটা জায়গা থাকবে। পরিবার ও বাবা-মায়ের কাছ থেকেও সমর্থন থাকবে যে হকিতেও বিশ্বকাপে খেলছে। এখন বাচ্চাদেরকে হকি খেলানো যায়। এসব চিন্তা করলে আমাদের বিশ্বকাপে যাওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জুনিয়র বিশ্বকাপে খেলতে পারলে বাংলাদেশে হকির পরিচিতি আরও অনেকবেশি বেড়ে যাবে।’
সম্প্রতি শেষ হওয়া প্রিমিয়ার লিগে চ্যাম্পিয়ন হয় ঊষা ক্রীড়াচক্র। দলটির হয়ে আসরে ৮ গোল করে শিরোপা জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন দেবাশীষ। ২০১৭ সালে বিকেএসপির হয়ে নেহেরু কাপে খেলতে গিয়ে করেছিলেন ৫ গোল।

আগের চেয়ে ভালো করার ব্যাপারে আশার জায়গা সৃষ্টি হলেও আর্থিক সংকটে দেশের হকি ফেডারেশন নিয়মিত করতে পারছে না খেলোয়াড়দের ক্যাম্প। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কোচ নিয়োগ দিতে না পারা অগ্রগতির পথে বড় বাধা। প্রতি টুর্নামেন্টের জন্য কোচ নিয়োগের পুরনো পথেই হাঁটছে ফেডারেশন। মামুনুর রশিদকে প্রধান কোচ এবং হেদায়েতুল ইসলাম রাজিবকে সহকারী কোচের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে দেবাশীষ বললেন, ‘আসলে বিষয়টা হল আমাদের হকি অঙ্গনে যারা আছেন, অনূর্ধ্ব-২১ দলে যারা আছে, তাদের নিয়ে মামুন স্যার অনেক বড় স্বপ্ন দেখছেন। বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখছেন। মামুন স্যার উঁচু পর্যায়ের একজন কোচ। স্যার সবসময় বলতেন, আমি যদি দীর্ঘমেয়াদে ক্যাম্প করাতে পারতাম টানা ২-৩ বছর, তাহলে এই দলটাকে অনেক হাই লেভেলে নিয়ে যেতে পারতাম। এখন এশিয়া কাপের যে ক্যাম্পটা চলছে একমাস ধরে, সবার আগে যেমন ফিটনেস ছিল, এখন তার চেয়ে ভালো। স্যারের স্বপ্ন আমরা পূরণ করব।’
জাতীয় দল ও বিকেএসপিতে দীর্ঘ সময় কোচিং করিয়েছেন গোবিনাথ কৃষ্ণমূর্তি। মালয়েশিয়ান এ কোচের সঙ্গে চুক্তি শেষের পর বর্ধিত করেনি হকি ফেডারেশন। দেশের হকির বৃহত্তর স্বার্থে গোবিনাথের থেকে যাওয়াটা দরকার ছিল বলেই মনে করেন দেবাশীষ।

‘আমি গোবিনাথ কৃষ্ণমূর্তির অধীনে ট্রেনিং নিয়েছি। জুনিয়র অলিম্পিকের ক্যাম্পে তার অধীনে ছিলাম দুই মাসের জন্য। কোচ হিসেবে উনি আসলে অনেক সমর্থন জুগিয়ে যান। এখনও আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন, কথা বলেন। আমাদের কোনো সমস্যা থাকলে দেশীয় কোচদের যেভাবে বলি, গোবিনাথের সঙ্গেও বলি।’
‘বিদেশি কোচ হিসেবে গোবিনাথ আমাদেরকে অনেককিছু দিয়েছেন। আসলে বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখতেন। বিকেএসপিতে গোবিনাথ দুই বছরের যে চুক্তিতে ছিলেন, আমার কাছে মনে হয় তাকে যদি আরও দীর্ঘমেয়াদে রাখা হতো, তাহলে ভালো হতো। বিকেএসপির ছাত্রদের সঙ্গে তার যে সুসম্পর্ক আছে, যদি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন, তাহলে বাংলাদেশের হকি এখন যে পর্যায়ে আছে, তার থেকে বেশি এগিয়ে যেত।’
বিশ্বকাপ আর এশিয়া কাপের প্রস্তুতির জন্য ভারতে ফ্রেন্ডশিপ ম্যাচ খেলতে যাওয়ার কথা ছিল জুনিয়র হকি টাইগারদের। যদিও সেটি বাতিল করা হয়েছে আচমকাই। ম্যাচ খেলার টেম্পার জুনিয়র এশিয়া কাপে অনেক কাজে দিতো বলেই দেবাশীষের বিশ্বাস। এক মাসের সফরে ১৪-১৫ ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা ছিল। ভালো কয়েকটি সিনিয়র দল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দলগুলোর সঙ্গে ম্যাচ খেলানোর চেষ্টা ছিল ফেডারেশনের।

যুব দলের সবাই বিশ্বকাপকে লক্ষ্যে রেখেই কাজ করছে। দেবাশীষ বললেন, ‘সেখানে যেসব দল আসবে তাদের সাথে অনেকবেশি লড়াই করতে পারব। আমাদের ফিটনেস লেভেল অনেক উঁচুতে আছে। এটাকে আর দুর্বলতার জায়গা মনে করার কোনো কারণ নেই।’
‘দেশের হকি নিয়ে আমার প্রথম স্বপ্ন বিশ্বকাপ খেলবে। ক্রিকেট দিয়ে যেমন বাংলাদেশকে সবাই চিনছে, হকিও সেভাবে চিনবে। পরিশ্রমের দ্বারা সামনের পথকে আমরা সুগম করতে পারি।’
হকির প্রচার-প্রসারে পৃষ্ঠপোষক-গণমাধ্যমের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিৎ সেটিও জানালেন বিকেএসপি থেকে উঠে আসা রংপুরের তরুণ, ‘সব খেলাতেই পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। হকি এখন খুব একটা জনপ্রিয় খেলা আমাদের এখানে নয়। এই দলটা বিশ্বকাপে খেলতে পারলে তখন স্পন্সরের অভাব হবে না। যে পর্যায়ে আমরা আছি, তাতে এখন স্পন্সর পাওয়া বেশি জরুরি। যে বিদেশে গেলে আমাদের ফলাফল ভালো হবে, তারা হয়তো আমাদেরকে এ ব্যাপারে বিশ্বাস করতে পারে না। কিন্তু তারা যদি এগিয়ে এসে আমাদের সমর্থন করে, তখন সামনের দিকে এগিয়ে যাব।’
‘গণমাধ্যম ছাড়া যেমন আমরা অচল, তেমনি আমরা ছাড়া আপনারা অচল। আমরা যখন ভালো কিছু করেছি, আপনারা যেভাবে আমাদের মেলে ধরেছেন, দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা সেভাবেই আছি। আপনাদের ভূমিকা কখনোই অস্বীকার করার কিছু নাই।’ যোগ করেন বিমানবাহিনীর এ খেলোয়াড়।








