বাংলাদেশে আশির দশকের যে সব তরুণ-তরুণী তাঁদের ভরা তারুণ্যে মঞ্চ নাটকের সাথে নিজেদেরকে রেখেছিলেন সীমাহীন স্বপ্ন, আবেগ আর ভালোবাসায় বন্ধনে তাঁদের অনেকেই এখন আর দেশে থাকেন না। বিদেশ বিভুঁই-এ পরবাসী।
আমেরিকা বা ইউরোপে অনেকেই ঘর-সংসার গড়ে স্থায়ী হয়েছেন। কিন্তু তাই বলে মঞ্চ নাটক বা থিয়েটারকে তাঁরা জীবন থেকে বিদায় জানিয়েছেন তা কিন্তু নয়। বিদেশ বিভুঁই-এও তাঁরা শত ব্যস্ততার মাঝেও মঞ্চ নাটককে জীবন্ত রেখেছেন।
ঢাকার শিল্পকলা বা বেইলি রোডের থিয়েটার হলে তাঁদের অভিনয় দেখা না গেলেও পরবাসে তাঁরা এখনও সজীব, প্রাণবন্ত, উচ্চকিত। ঠিক সেরকমই একটি সংগঠন ‘ডালাস বাংলা থিয়েটার’। উত্তর আমেরিকার পরিচিত ও প্রিয় এক নাম। সেই আশি-নব্বই দশকে ঢাকার মঞ্চ নাটকে অভিনয় করা যে সব তরুণ-তরুণীরা পাড়ি জমিয়েছেন ডালাসে তাঁদেরই হাতে গড়া প্রিয় সংগঠন এটি। তাঁরাই এই সংগঠনকে উজ্জীবিত রেখেছে। তাঁরাই প্রতিবছর একটি করে নতুন নাটক মঞ্চে নিয়ে আসেন। সেই নাটকে তুলে ধরেন ইতিহাস-ঐতিহ্য আর পরবর্তীত পৃথীবির নতুন নতুন আবাহন।
বাংলা সংস্কৃতি এবং বাংলা নাটকের চর্চার আন্দোলনকে তাঁরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অক্লান্ত পরিশ্রম আর ভালোবাসার সংমিশ্রণে। কদিন আগে উত্তর আমেরিকাতে মুনীর শিশিরের নির্দেশনায় ‘ডালাস বাংলা থিয়েটার’ তাঁদের নতুন ১২তম প্রযোজনা ‘মাউসট্র্যাপ’ নিয়ে আসে। অগাথা ক্রিষ্টির লেখা নতুন এই প্রযোজনা ‘মাউসট্র্যাপ’ মঞ্চস্থ করে ডালাসের আরভিং আর্ট সেন্টারে।। নিয়ম অনুযায়ী দুটো শো করেন তাঁরা। এবারের আয়োজন ছিল একটু ভিন্ন ধর্মী। শুধু নতুন নাটকই মঞ্চায়ন নয় ছিল আলোচনা পর্ব এবং সম্মাননা অনুষ্ঠান। ‘প্রবাসে নাট্যচর্চা’ বিষয়ে মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা হয়। আর বাংলাদেশের অন্যতম নাট্যজন মামুনুর রশীদকে দেওয়া হয় আজীবন সম্মাননা।
বাংলাদেশ থেকে আরও গিয়েছিলেন নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আ. সেলিম, নাট্য গবেষক বাবুল। গত কয়েকবছরে ‘ডালাস বাংলা থিয়েটার’ আমেরিকা প্রবাসীদের কাছে নতুন নতুন নাটক উপহার দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন খান আনিসুজ্জামান মানিক এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন জিয়াউল হক। খান আনিসুজ্জামান মানিক এবং জিয়াউল হক এ দুজনই আশি ও নব্বই দশকে ঢাকার মঞ্চ নাটকের পরিচিত মুখ। আনিসুজ্জামান মানিক পদাতিকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। অন্যদিকে জিয়াউল হক প্রথমে পদাতিকের সাথে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে লোক নাট্যদলের ‘কঞ্জুস’ ও অন্যান্য নাটকে অভিনয় করে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন।
জিয়াউল হক অভিনয়ের পাশাপাশি ভালো শিল্পী হিসেবেও খ্যাত। এ ছাড়াও ‘ডালাস বাংলা থিয়েটার’-এর সাথে আরও সংযুক্ত রয়েছেন আলপনা হক। মঞ্চের এই শিল্পী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকার সময় লোকনাট্য দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। পদ্মা নদীর মাঝি, কঞ্জুস, হেলেন-প্রভৃতি নাটকে তিনি অভিনয় করেন দলের পক্ষে। ‘ডালাস বাংলা থিয়েটার’-এ আরো আছেন বেশ কয়েকজন সম্ভাবনাময় তরুণ ও তরুণী। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আনিলা গুহ, নাবিলা নুর। ‘ডালাস বাংলা থিয়েটার’-এর অন্যতম সংগঠক আশি ও নব্বই দশকে বাংলাদেশে থিয়েটার আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ আলপনা হক। ‘মাউসট্র্যাপ’ নাটকে তিনি মিসেস বয়েল চরিত্রে অভিনয় করেছেন। মঞ্চে অভিনয় করছেন অনেক অনেক দিন।
তিনি বলেন, ‘আশি ও নব্বই দশকে দেশে থিয়েটার ছিল আমাদের প্রাণ। মানুষের অধিকার আন্দোলন-সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে আমরা সবসময় মঞ্চকেই উপজীব্য করেছি। ঢাকার সেই মঞ্চ, সেই নাটক জীবনের এক অনন্য স্মৃতি। সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন বার্তা দিতে আমরা এখনও থিয়েটার চর্চায় আঁকড়ে আছি। এখানে একটা সুন্দর টিমওয়ার্কের মধ্যে দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সমগ্র উত্তর আমেরিকাতে ‘ডালাস বাংলা থিয়েটার’ এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। জীবন-জীবিকা সব তুচ্ছ করেও আমরা সৃষ্টিশীলতার পথ থেকে সরে আসিনি। তাই এখনও মঞ্চ নাটকে আমরা খুঁজে পাই নতুন এক প্রাণ। যে প্রাণে আছে শেকড়কে আঁকড়ে রাখা, বৈষম্যহীন সমাজ, মানবিক এক পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন।’







