আন্তর্জাতিক

ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে শিশুদের আসক্ত করার অভিযোগ নাকচ করল মেটা

মেটার লোগো সহ মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছে।. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

মেটার লোগো সহ মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছে, যা সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করে।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

এক প্রজন্মের শিশুকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে আসক্ত করে তোলার অভিযোগ উঠেছে মেটার বিরুদ্ধে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আইনি চ্যালেঞ্জের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এ অভিযোগের শুনানি শুরু হয়েছে।

বুধবার (১৯ অগাস্ট) সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই তথ্য জানায়।

ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ডে একটি জুরি আগামী ছয় সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের শীর্ষ আইনজীবী এবং মেটার আইনজীবীদের যুক্তি ও প্রমাণ পর্যালোচনা করবেন।

মঙ্গলবার শুনানির শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবী অভিযোগ করেন, মেটা জানত যে ১১ ও ১২ বছর বয়সী ‘লাখ লাখ’ শিশু ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করছে। কিন্তু তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে দূরে রাখতে প্রতিষ্ঠানটি ‘খুব কমই উদ্যোগ’ নিয়েছে।

তবে মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই বয়সী ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক লাখের কিছু বেশি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি বলে কোনো বিষয় নেই।

ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবীর দাবি, মেটা জানত তাদের প্ল্যাটফর্ম কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিপরীতে মেটার আইনজীবীরা বলেন, প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ফলে আরও অনেক কিশোর ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পেয়েছে—এই বিষয়টি উপেক্ষা করা হচ্ছে।

২০২৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে। সেই মামলার সূত্র ধরেই বর্তমান বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, শিশুদের সুরক্ষা ও গোপনীয়তা-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য আইন মেটা বহুবার লঙ্ঘন করেছে।

অঙ্গরাজ্যগুলো মেটার কাছ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে পরিবর্তন আনারও দাবি জানিয়েছে তারা। এর মধ্যে ‘লাইক’ সংখ্যার প্রদর্শন বন্ধ করা এবং অসীম স্ক্রলিং সুবিধা বাতিলের মতো পদক্ষেপও রয়েছে।

শুনানির শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান আইনজীবীদের একজন মেগান ও’নিল মামলায় মেটার পক্ষ থেকে সরবরাহ করা লাখ লাখ নথির ওপর জোর দেন। এসব নথির মধ্যে ছিল প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ গবেষণা, কর্মীদের ই-মেইল এবং চ্যাটের তথ্য, যার কিছু সরাসরি মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

ইনস্টাগ্রাম নিয়ে করা একটি অভ্যন্তরীণ গবেষণায় বলা হয়েছিল, ‘ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিশোরদের আচরণ একজন আসক্ত ব্যক্তির মতো।’

আরেকটি অভ্যন্তরীণ গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে ও’নিল বলেন, মেটা নিজেই স্বীকার করেছিল ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় ধরে রাখার জন্য তৈরি ফিচারগুলো তাদের সুস্থতার সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দেওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

মেটা এসব নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে অবগত থাকার পরও তরুণদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকারী হিসেবে আকৃষ্ট করেছে বলে অভিযোগ করেন ও’নিল। তার দাবি, শিশুদের জন্য প্ল্যাটফর্মগুলো নিরাপদ এমন ধারণা তৈরি করতে মেটা জনসাধারণকে আশ্বস্ত করার জন্য বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়েছিল।

মেটার ব্যবসায়িক মডেলকে সংক্ষেপে তুলে ধরে ও’নিল বলেন, ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করা, যতটা সম্ভব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা, তাদের তথ্য সংগ্রহ করা এবং জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সময় সত্যকে আড়াল করা এই চারটি বিষয়ই এর কেন্দ্রে।

তিনি বলেন, পুরো বিচার চলাকালে স্পষ্ট হবে যে প্ল্যাটফর্মগুলো নিয়ে মেটা প্রকাশ্যে যা বলেছে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ গবেষণায় যা উঠে এসেছে, তার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

ও’নিলের ভাষ্য, মেটা প্রকাশ্যে বলেছে তারা মুনাফার চেয়ে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু বাস্তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বারবারই মুনাফা অগ্রাধিকার পেয়েছে এবং সেই বাস্তবতা আড়াল করা হয়েছে।

মেটার প্রধান আইনজীবী পল শ্মিট ক্যালিফোর্নিয়ার পক্ষের উপস্থাপিত অভ্যন্তরীণ গবেষণার সরাসরি জবাব দেন।

ও’নিল যে নথিটি জুরিদের সামনে তুলে ধরেছিলেন, সেখানে বলা হয়েছিল, প্রতি পাঁচজন কিশোরের একজন মনে করে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের পর তারা আরও খারাপ অনুভব করে।

শ্মিট বলেন, ‘শুনতে বেশ খারাপই লাগছে।’

তবে তিনি নথিটির অন্য তথ্যও তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, ৪১ শতাংশ কিশোর বলেছে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে তারা ভালো অনুভব করে এবং আরও ৪১ শতাংশ বলেছে, এর কোনো প্রভাবই তাদের ওপর পড়ে না।

মেটার আইনজীবী অঙ্গরাজ্যগুলোর সেই দাবিকেও চ্যালেঞ্জ করেন যে, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ ঠেকাতে মেটা শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে শিশু ও কিশোরদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ‘আসক্ত’ করেছে। তিনি এ-ও অস্বীকার করেন যে প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারীরা আসক্ত হয়ে পড়ে।

প্রতিটি ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করা সম্ভব কি না এ নিয়েও মেটার অবস্থান তুলে ধরেন শ্মিট। তিনি বলেন, যে গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, সেই আইনই অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের কার্যকরভাবে শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারে প্রতিষ্ঠানটির ওপর সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।

চলতি বছর অন্যান্য মামলাতেও মেটা যে যুক্তি দিয়েছে, শ্মিট এখানেও তার পুনরাবৃত্তি করেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি বলে কোনো স্বীকৃত বিষয় নেই।

তিনি বলেন, মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারে মেটা বিষয়টি স্বীকার করেছে এবং তা মোকাবিলায় বিভিন্ন সরঞ্জামও তৈরি করেছে। তবে এটিকে ‘আসক্তি’ হিসেবে অভিহিত করার সঙ্গে মেটা একমত নয়।

এ সময় মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ এবং ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরির আগের বক্তব্যের উল্লেখ করেন শ্মিট। তাদের বক্তব্য ছিল, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম আসক্তি তৈরির উদ্দেশ্যে বানানো হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি তৈরি হতে পারে এমন দাবির পক্ষে কোনো গবেষণালব্ধ প্রমাণও নেই বলে আদালতে যুক্তি দেন মেটার আইনজীবী।

বিষয়:ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামমেটাসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…